মৃত্যুর ১১ বছর পরও কেন দর্শকের হৃদয়ে অমর অভিনেতা খলিল উল্লাহ খান?
বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে যেসব অভিনেতা তাদের প্রতিভা দিয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, খলিল উল্লাহ খান তাঁদের অন্যতম। মৃত্যুর এক যুগ পেরিয়ে গেলেও আজও তিনি দর্শকের মনে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মুগ্ধতার প্রতীক হয়ে আছেন। তার অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও জীবনসংগ্রাম নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।
খলিল উল্লাহ খানের পুরো নাম আবুল ফজল মোহম্মদ খলিল উল্লাহ খান। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, ভারতের মেদিনীপুর জেলায়। তার বাবা ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে—সিলেট, কৃষ্ণনগর, বগুড়া, বর্ধমান ও নোয়াখালীর মতো জায়গায়। এই ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠাই তার চিন্তা-চেতনায় বৈচিত্র্য এনে দেয়, যা পরবর্তীতে তার অভিনয়ে গভীর প্রভাব ফেলে।
শিক্ষাজীবনে খলিল উল্লাহ খান ছিলেন মনোযোগী ছাত্র। তিনি ১৯৪৮ সালে সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৫১ সালে সিলেটের মদনমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ কলেজে, সেখান থেকেই স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তার ভেতরে ধীরে ধীরে শিল্পচর্চার আগ্রহ জন্ম নিতে থাকে।
চাকরিজীবনের শুরুতে অভিনয় ছিল না তার প্রধান পেশা। ১৯৫১ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে আনসার বাহিনীতে এডজুট্যান্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ১৯৯২ সালে আনসার বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় এই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তার মন পড়ে থাকত অভিনয়ের জগতে।
খলিল উল্লাহ খানের অভিনয়জীবনের সূচনা ঘটে টেলিভিশন নাটকের মাধ্যমে। তখন টেলিভিশন ছিল সীমিত পরিসরের মাধ্যম, কিন্তু মানসম্মত অভিনয়ের জন্য ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক একটি প্ল্যাটফর্ম। বিটিভিসহ বিভিন্ন নাটকে তার সাবলীল অভিনয় দর্শক ও নির্মাতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খুব দ্রুতই তিনি নিজেকে একজন শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
টেলিভিশনের পর চলচ্চিত্রে পা রাখেন খলিল উল্লাহ খান। ১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সোনার কাজল’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় তার অভিষেক ঘটে। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন ষাটের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক। তার অভিনয়ে ছিল ব্যক্তিত্ব, সংলাপ বলার দক্ষতা এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা।
তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘পুনম কি রাত’, ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’, ‘উলঝান’, ‘সমাপ্তি’, ‘নদের চাঁদ’, ‘বেঈমান’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘আলোর মিছিল’, ‘আয়না’, ‘মধুমতি’, ‘ওয়াদা’, ‘ভাই ভাই’, ‘বিনি সুতার মালা’, ‘মাটির পুতুল’, ‘অভিযান’, ‘কার বউ’, ‘দিদার’, ‘আওয়াজ’, ‘নবাব সিরাজউদ দৌলা’ ও ‘ভণ্ড’। প্রতিটি ছবিতেই তিনি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।
টেলিভিশন নাটকের ক্ষেত্রে খলিল উল্লাহ খানের সবচেয়ে আলোচিত কাজ ‘সংশপ্তক’। শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে নাট্যব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ আল মামুন নির্মিত এই ধারাবাহিকে “মিয়ার ব্যাটা” চরিত্রে তার অভিনয় আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে। এই চরিত্রে তিনি যে বাস্তবতা, প্রতিবাদী মনোভাব ও আবেগ তুলে ধরেছিলেন, তা বাংলা নাটকের ইতিহাসে অনন্য।
অভিনয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে খলিল উল্লাহ খান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ‘গুণ্ডা’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় সমালোচক ও দর্শক—দুই মহলেই প্রশংসিত হয়। এই পুরস্কার তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও শৃঙ্খলাবান। দীর্ঘদিন সরকারি চাকরির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তার জীবনযাপনে ছিল নিয়মতান্ত্রিকতা। সহকর্মীরা তাকে একজন ভদ্র, সময়নিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন। নতুন শিল্পীদের প্রতি তার সহযোগিতামূলক মনোভাব ছিল প্রশংসনীয়।
২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর এই গুণী শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। তার প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যাঙ্গনে নেমে আসে গভীর শোক। যদিও তিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই, তবে তার সৃষ্টি, চরিত্র এবং অভিনয় আজও জীবন্ত।
মৃত্যুর ১১ বছর পরও খলিল উল্লাহ খান প্রমাণ করে দিয়েছেন—একজন সত্যিকারের শিল্পী কখনো হারিয়ে যান না। তার অভিনয় নতুন প্রজন্মের দর্শক ও শিল্পীদের কাছে এখনও অনুপ্রেরণা। টেলিভিশনের পর্দা কিংবা চলচ্চিত্রের রিল—সবখানেই তিনি রেখে গেছেন নিজের স্বাক্ষর।
মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন অভিনেতাকে নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতির একটি গৌরবময় অধ্যায়কে শ্রদ্ধা জানানো। ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে খলিল উল্লাহ খান চিরকাল বেঁচে থাকবেন দর্শকের হৃদয়ে।
