জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও সব ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি! লুৎফুন নাহার লতার অজানা জীবনকথা


বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে আশির দশক ছিল এক স্বর্ণালি সময়। এই সময়েই জন্ম নেয় অসংখ্য গুণী অভিনয়শিল্পী, যাঁদের অভিনয় আজও দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে। সেই তালিকায় অন্যতম উজ্জ্বল নাম লুৎফুন নাহার লতা। অভিনয়গুণ, ব্যক্তিত্ব ও পরিণত মানসিকতার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য শিল্পী।

লুৎফুন নাহার লতা মূলত পরিচিতি পান বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে। বিশেষ করে লেখক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের নাটকে তাঁর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। ‘বহুব্রীহি’, ‘এইসব দিনরাত্রি’ ও ‘চর আতরজান’—এই নাটকগুলোতে তাঁর অভিনয় দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। সংলাপ বলার সাবলীলতা, চোখের অভিব্যক্তি আর চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।

শুধু টেলিভিশনেই নয়, চলচ্চিত্রেও লুৎফুন নাহার লতা রেখে গেছেন নিজের ছাপ। ‘একাত্তরের লাশ’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয় সমালোচক ও দর্শক—উভয়ের কাছেই। সেই সময় খুব কম শিল্পীই টিভি ও সিনেমা—দুই মাধ্যমেই সমান দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। পাশাপাশি মঞ্চনাটকেও ছিল তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। নাট্যদলগুলোর নিয়মিত প্রযোজনায় তাঁকে দেখা যেত, যেখানে তিনি চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতেন।

আশি ও নব্বই দশকে লুৎফুন নাহার লতা ছিলেন টিভি নাটকের সবচেয়ে ব্যস্ত অভিনয়শিল্পীদের একজন। ধারাবাহিক নাটক, একক নাটক, মঞ্চ—সব জায়গাতেই তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল। দর্শক অপেক্ষা করত নতুন নাটকে তাঁকে দেখার জন্য। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, জনপ্রিয়তার ঠিক সেই শীর্ষ মুহূর্তেই তিনি হঠাৎ করে সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।

১৯৯৭ সালে লুৎফুন নাহার লতা দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত। বিনোদনজগতের আলোঝলমলে জীবন ছেড়ে এক ভিন্ন পরিবেশে নতুন জীবন শুরু করা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আত্মজীবনের প্রয়োজনেই। ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যান তিনি, থেমে যায় তাঁর অভিনয়জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়।

ব্যক্তিগত জীবনে লুৎফুন নাহার লতার জীবন ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা। তাঁর সাবেক স্বামী ছিলেন মেজর (অব.) নাসিরউদ্দিন। তাঁদের দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি ঘটে বিবাহবিচ্ছেদের মাধ্যমে। তবে এই অধ্যায় নিয়ে তিনি কখনোই নেতিবাচক কথা বলেননি। বরং পরিণত মানসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি বারবার ক্ষমা ও সম্মানের কথা বলেছেন।

পরবর্তীতে নিউইয়র্কপ্রবাসী মার্কিন নাগরিক মার্ক ওয়াইনবার্গকে বিয়ে করেন লুৎফুন নাহার লতা। পেশায় তিনিও একজন শিক্ষক। বর্তমানে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাস করছেন। অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও শিক্ষা ও সমাজসংলগ্ন জীবনেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের নতুন পরিচয়।

এক সাক্ষাৎকারে সাবেক স্বামীকে ক্ষমা করা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে লুৎফুন নাহার লতা বলেন, জীবনে কাউকে ক্ষমা করতে পারা এবং নিজেকে দূরে রাখতে পারাই সবচেয়ে বড় মানসিক মুক্তি। তাঁর ভাষায়, জীবনে ভাঙাগড়া থাকবেই, কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই আসল।

সাবেক স্বামীকে নিয়ে বর্তমান সময়ে কিছু বলার আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি অত্যন্ত সংযত ও মানবিক উত্তর দেন। তিনি বলেন, তাঁর একমাত্র চাওয়া হলো সবাই ভালো থাকুক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক স্বামীই তাঁর সন্তানের বাবা। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক হিসেবে তাঁর পরিচয় সন্তানকে গর্ব করার সুযোগ দিয়েছে। সন্তানকে তিনি সবসময় বাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছেন।

এই বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে লুৎফুন নাহার লতার পরিণত মানসিকতা ও একজন দায়িত্বশীল মায়ের ভূমিকা। ব্যক্তিগত কষ্ট বা অতীতের অভিজ্ঞতা কখনোই তিনি সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, সম্মান ও মূল্যবোধ দিয়েই একটি শিশুকে বড় করা উচিত।

আজকের দিনে লুৎফুন নাহার লতা হয়তো ক্যামেরার সামনে নেই, কিন্তু তাঁর জীবনগল্প এখনো অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও সব ছেড়ে দেওয়া, নতুন দেশে নতুনভাবে জীবন গড়া এবং অতীতকে ক্ষমার চোখে দেখা—এই গুণগুলো তাঁকে শুধু একজন অভিনেত্রী নয়, বরং একজন শক্ত ও মানবিক মানুষ হিসেবে তুলে ধরে।

বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসে লুৎফুন নাহার লতা তাই শুধু একটি নাম নয়, একটি সময়, একটি মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। তাঁর অভিনয় যেমন দর্শকের মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তেমনি তাঁর জীবনদর্শনও থেকে যাবে নীরব অনুপ্রেরণা হয়ে।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!