চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে ওসমান হাদির মৃত্যু, দেশজুড়ে শোক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত


ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও আলোচিত রাজনৈতিক সংগঠক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ইনকিলাব মঞ্চের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ চিকিৎসা

গত ১২ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় রিকশায় থাকা অবস্থায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে কয়েকদিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকলেও তাঁর শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। অবশেষে বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

রাষ্ট্রীয় শোক ও প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ

শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দেন। ওই দিন দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া শুক্রবার বাদ জুমা দেশের সব মসজিদে ওসমান হাদির রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়গুলোতেও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে বলে জানানো হয়।

প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং জানান, ওসমান হাদির স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করবে।

রাজনৈতিক পরিচিতি ও উত্থান

ঝালকাঠির নলছিটি থেকে উঠে আসা শরিফ ওসমান হাদির রাজনৈতিক পথচলা ছিল ব্যতিক্রমী। মাদ্রাসার শিক্ষক বাবার সন্তান হাদি নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। সংগঠনটির মাধ্যমে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেন।

প্রথমে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে আহ্বায়কের ভূমিকা নেন। নিয়মিত টেলিভিশন টকশো ও রাজনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত তাঁর একটি শক্ত সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে।

নির্বাচনী রাজনীতি ও বিতর্ক

ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেন। তাঁর প্রচারণা ছিল ভিন্নধর্মী—ফজরের নামাজের পর ভোট চাওয়া, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ এবং অনুদান গ্রহণের বিষয়গুলো তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত তুলে ধরতেন।

আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী বক্তব্যের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আলোচনায় ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি এবং জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে প্রকাশ্যে মত দেন।

আগাম হুমকি ও নিরাপত্তা শঙ্কা

গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় এক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা জানান। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন ও বার্তার মাধ্যমে তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবুও ‘ইনসাফের লড়াই’ থেকে সরে দাঁড়াবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

তদন্ত ও গ্রেপ্তার

এই হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশ ও র‍্যাব ১৪ জনকে আটক ও গ্রেপ্তার করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, যিনি ঘটনার পর ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গ্রেপ্তারদের মধ্যে সন্দেহভাজনের পরিবারের সদস্য, সহযোগী এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিরা রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনার পেছনের সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও জাতীয় প্রভাব

ওসমান হাদির ওপর হামলা এবং তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিএনপিসহ একাধিক দল এটিকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে। সরকারও ঘটনাটিকে নির্বাচনের আগে সহিংসতার সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন করে নিরাপত্তা ও সহনশীলতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপদ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

শেষকথা

শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার প্রস্থান নয়, বরং একটি সময়ের প্রতীকী অবসান। তাঁর উত্থান, সংগ্রাম ও বিতর্ক দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রীয় শোকের মধ্য দিয়ে দেশ তাঁকে বিদায় জানাচ্ছে, আর একই সঙ্গে সামনে দাঁড় করাচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতা রোধ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার বড় চ্যালেঞ্জ।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!