প্রবাসীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর! ইকামা ফি মওকুফ করল সৌদি সরকার
সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। দীর্ঘদিন পর শিল্প খাতে কর্মরত প্রবাসীদের ওপর আরোপিত ইকামা বা ওয়ার্ক পারমিট ফি সম্পূর্ণভাবে মওকুফ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সৌদি গেজেটের প্রতিবেদনে জানানো হয়, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক ও উন্নয়নবিষয়ক পরিষদ বা সিইডিএ-এর সুপারিশের ভিত্তিতেই মন্ত্রিসভা ইকামা ফি মওকুফের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রায় সাত থেকে আট বছর পর সৌদি আরবে প্রবাসী কর্মীদের জন্য এ ধরনের বড় ছাড় ঘোষণা করা হলো।
এই সিদ্ধান্ত মূলত লাইসেন্সপ্রাপ্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এতদিন শিল্প খাতে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট হারে ফি পরিশোধ করতে হতো, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেই চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সৌদি আরবের শিল্প ও খনিজসম্পদমন্ত্রী বান্দার আলখোরায়েফ এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর আরোপিত আর্থিক চার্জ মওকুফের মাধ্যমে সৌদি শিল্প খাতে টেকসই উন্নয়ন আরও জোরদার হবে। একই সঙ্গে এটি শিল্প খাতকে আরও বিনিয়োগবান্ধব করে তুলবে।
মন্ত্রী আরও জানান, ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ধারাবাহিকভাবে শিল্প খাতকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ইকামা ফি বাতিলের সিদ্ধান্ত সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। এর ফলে সৌদি আরবের শিল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে এবং তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের সরাসরি সুফল পাবেন প্রবাসী শ্রমিকরা। অনেক ক্ষেত্রে ইকামা ফি-এর বোঝা পরোক্ষভাবে শ্রমিকদের ওপর পড়ে। ফি মওকুফ হওয়ায় চাকরির নিরাপত্তা বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং শ্রমবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে। এতে করে কারখানাগুলো উৎপাদন সম্প্রসারণে আগ্রহী হবে এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়াবে। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বহুমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ভিশন ২০৩০-এর আওতায় শিল্প, খনিজ, প্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসী শ্রমিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইকামা ফি মওকুফের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ শ্রম ব্যয় কমলে উৎপাদন খরচও কমে আসে, যা যেকোনো বিনিয়োগকারীর জন্য বড় সুবিধা। ফলে সৌদি আরবে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়বে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা এই ঘোষণাকে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক প্রবাসী এই সিদ্ধান্তকে “বড় স্বস্তির খবর” হিসেবে উল্লেখ করছেন। বিশেষ করে যারা শিল্প খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, তাদের জন্য এটি আর্থিক ও মানসিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সৌদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে এটি একটি বাস্তবমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও শ্রমবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব সিদ্ধান্ত আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।
