হঠাৎ সিনেমা ছাড়ার সিদ্ধান্ত! কিংবদন্তি নায়িকা শাবানা ও তার সন্তানদের প্রবাসে নীরব জীবন
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে কয়জন নারী শিল্পী দীর্ঘ সময় ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছেন, শাবানা তাঁদের মধ্যে অন্যতম, বরং বলা যায় শীর্ষস্থানীয়। কয়েক দশক ধরে তাঁর উপস্থিতি, অভিনয় দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব বাংলা সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছে। দর্শকের ভালোবাসা, নির্মাতাদের আস্থা এবং সহশিল্পীদের সম্মান—সবকিছু মিলিয়ে শাবানা হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য কিংবদন্তি।
শাবানার অভিনয়জীবন শুরু হয়েছিল তুলনামূলক কম বয়সেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন পরিপূর্ণ অভিনেত্রী হিসেবে। রোমান্টিক চরিত্র থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক ও শক্ত নারী চরিত্র—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমান সাবলীল। তাঁর অভিনয়ে ছিল সংযম, গভীরতা ও বাস্তবতার ছোঁয়া, যা দর্শককে সহজেই চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলত।
সত্তর, আশি ও নব্বই দশক—এই দীর্ঘ সময়ে শাবানা ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নায়িকা। অসংখ্য ব্যবসাসফল ও সমালোচকপ্রশংসিত ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ইন্ডাস্ট্রির অপরিহার্য অংশ হিসেবে। সহশিল্পী হিসেবে তিনি পেয়েছেন দেশের প্রায় সব জনপ্রিয় নায়ককে, আর প্রতিটি জুটিতেই তিনি ছিলেন সমানভাবে প্রভাবশালী।
কিন্তু এত জনপ্রিয়তা, সফলতা ও ব্যস্ততার মাঝেই ১৯৯৭ সালে শাবানা একটি চমকপ্রদ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আর চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন না। এই সিদ্ধান্তে তখন বিস্মিত হয়েছিল পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গন। দর্শক থেকে শুরু করে সহকর্মীরা কেউই সহজে বিশ্বাস করতে পারেননি যে, শাবানা সত্যিই পর্দা থেকে বিদায় নিচ্ছেন।
তাঁর এই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও পরিবারকেন্দ্রিক। দীর্ঘদিনের কর্মব্যস্ত জীবনের পর তিনি চেয়েছিলেন পরিবারকে আরও বেশি সময় দিতে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে এবং এক ভিন্ন, শান্ত জীবন বেছে নিতে। সেই ভাবনা থেকেই ২০০০ সালে শাবানা স্বামী সাদিক ও সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
শাবানা-সাদিক দম্পতির সংসারে রয়েছে তিন সন্তান—দুই কন্যা সুমি ও ঊর্মি এবং একমাত্র পুত্র নাহিন। যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর থেকেই শাবানা পুরোপুরি মনোযোগ দেন সন্তানদের পড়াশোনা ও পারিবারিক জীবনে। আলো-ঝলমলে তারকা জীবন থেকে সরে এসে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন একজন পূর্ণকালীন মা ও অভিভাবক হিসেবে।
বিশেষ করে তাঁর পুত্র নাহিনকে নিয়ে ভক্তদের কৌতূহল বরাবরই ছিল। একজন কিংবদন্তি নায়িকার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও নাহিনকে কখনোই মিডিয়ার আলোয় আনা হয়নি। শাবানা সচেতনভাবেই সন্তানদের ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, খ্যাতির চাপ থেকে দূরে থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করাই সন্তানদের জন্য সবচেয়ে ভালো।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও শাবানা কখনোই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আবেগ সবসময়ই অটুট ছিল। তবে তিনি নিজেকে সচেতনভাবে লাইমলাইটের বাইরে রেখেছেন। খুব কম সাক্ষাৎকার, খুব সীমিত উপস্থিতি—এই নীরবতার মধ্যেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন নিজের শান্তি।
শাবানার জীবনদর্শন বরাবরই ছিল পরিমিত ও বাস্তবধর্মী। তিনি বিশ্বাস করতেন, জনপ্রিয়তা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধ আজীবনের। সেই বিশ্বাস থেকেই হয়তো তিনি ক্যারিয়ারের শীর্ষে থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছিলেন—যা খুব কম তারকাই করতে পারেন।
আজকের দিনে শাবানা যুক্তরাষ্ট্রে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অভিনয় জগতে তিনি আর সক্রিয় নন, কিন্তু তাঁর কাজ এখনো নিয়মিত টিভি পর্দা ও অনলাইন মাধ্যমে দর্শকের কাছে ফিরে আসে। নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়, বুঝতে পারে কেন শাবানাকে বলা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি।
শাবানার এই জীবনপথ আমাদের শেখায়, সফলতা মানেই শুধু ক্যারিয়ার নয়। সময়মতো থেমে যাওয়া, অগ্রাধিকার বদলানো এবং পরিবারের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করাও এক ধরনের সাহসী সিদ্ধান্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন নারী একই সঙ্গে সফল শিল্পী ও দায়িত্বশীল মা হতে পারেন—এবং প্রয়োজন হলে একটিকে বেছে নিতেও পারেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শাবানা তাই শুধু একজন জনপ্রিয় নায়িকা নন, তিনি এক আদর্শের নাম। তাঁর অভিনয় যেমন অমর হয়ে থাকবে, তেমনি তাঁর জীবন সিদ্ধান্তও থেকে যাবে বহু মানুষের জন্য নীরব অনুপ্রেরণা হয়ে।
