বিএনপি থেকে জামায়াত: সাবেক এমপি মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়


বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলবদলের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে কোনো সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন সবসময়ই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) সকাল ৯টায় রাজধানীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ দলের শীর্ষ নেতারা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজে এ সংক্রান্ত ছবি ও তথ্য প্রকাশ করা হয়।

আনুষ্ঠানিক যোগদান ও বক্তব্য

জামায়াতে যোগদানের সময় মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান দলের নীতি, আদর্শ ও সাংগঠনিক কাঠামোর প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তাকে অনুপ্রাণিত করেছে।

সাক্ষাৎকালে তিনি ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে দেশের স্বার্থে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি জামায়াতের নিয়ম-নীতি, দলীয় শৃঙ্খলা ও আনুগত্য মেনে চলার অঙ্গীকারও করেন। পরে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান তাকে আলিঙ্গন করেন এবং তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করেন।

বিএনপি থেকে বহিষ্কার ও রাজনৈতিক পটভূমি

এর আগে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন আক্তারুজ্জামান। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ছিলেন এবং দলটির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদের কাছে পরাজিত হন।

এর আগে বিএনপির মনোনয়নে তিনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় কিশোরগঞ্জ-২ আসনটি শুধুমাত্র কটিয়াদী উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল। সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

মুক্তিযোদ্ধা ও সামরিক পরিচয়

মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকার কথা বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। সামরিক বাহিনীতে কর্মরত থাকার অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে সামরিক পটভূমি থেকে এসে ভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় যুক্ত হওয়াকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া

আক্তারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদানকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে জামায়াতে যুক্ত হওয়া আক্তারুজ্জামান দলের জন্য নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে তার ভূমিকা ভবিষ্যতে কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের পক্ষ থেকে জানায়, আক্তারুজ্জামানের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকের যুক্ত হওয়া দলটির জন্য ইতিবাচক। দলটি দাবি করে, তারা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নৈতিক রাজনীতির পক্ষে অবিচল অবস্থান ধরে রেখেছে।

জামায়াত নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সদস্যরা দলের আদর্শ ও শৃঙ্খলা মেনে সংগঠনের কার্যক্রমে যুক্ত হবেন—এটাই তাদের প্রত্যাশা।

পরিবর্তনশীল রাজনীতির বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলবদল প্রায়ই আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বাস্তবতা, ব্যক্তিগত অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কৌশল—সবকিছু মিলিয়েই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানের এই সিদ্ধান্তও সেই বাস্তবতারই অংশ। বিএনপির সাবেক এই এমপি নতুন রাজনৈতিক পরিসরে কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন, তা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শেষ কথা

একজন সাবেক সংসদ সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের চলমান রাজনৈতিক গতিধারার একটি প্রতিফলন।

মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদান বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে—সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তার ভবিষ্যৎ ভূমিকা।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!