সৌদি আরবে শিল্প শ্রমিকদের জন্য প্রবাসী ফি বাতিল: অর্থনৈতিক সংস্কারে নতুন মাইলফলক
সৌদি আরবের শিল্প খাতে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর এসেছে। দেশটির সরকার শিল্প লাইসেন্সের অধীনে নিবন্ধিত কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের ওপর আরোপিত ‘প্রবাসী ফি’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে সৌদি আরবের চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার ও শিল্প খাত শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত
সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাফেয়ার্সের (সিইডিএ) সুপারিশের ভিত্তিতে মন্ত্রিপরিষদ এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে।
সরকারি সূত্রের বরাতে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, শিল্প খাতের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী ফি কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
প্রবাসী ফি হলো সৌদি আরবে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের জন্য নিয়োগকর্তার মাধ্যমে পরিশোধযোগ্য একটি নির্দিষ্ট ফি, যা দীর্ঘদিন ধরে শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করছিল। বিশেষ করে শিল্প খাতে এই অতিরিক্ত খরচ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছিল, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।
এই ফি বাতিলের ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক চাপ কমবে এবং একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সৌদি সরকার
সৌদি গেজেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্প খাতকে শক্তিশালী করতে সৌদি নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা দিয়ে আসছে। জাতীয় কারখানাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
এই সিদ্ধান্ত যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শিল্প খাতের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনারই ধারাবাহিকতা।
সৌদি ভিশন ২০৩০ ও শিল্প খাতের ভূমিকা
সৌদি আরব বর্তমানে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নে জোরালোভাবে কাজ করছে। এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করা।
এই লক্ষ্য অর্জনে শিল্প খাতকে অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করছে সৌদি সরকার। উৎপাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই ভিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব
সৌদি আরবের শিল্প ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বন্দর আলখোরায়েফ বলেছেন, শিল্প শ্রমিকদের জন্য প্রবাসী ফি বাতিলের সিদ্ধান্ত টেকসই শিল্প উন্নয়নকে আরও গতিশীল করবে। তিনি এই সিদ্ধান্তের জন্য সৌদি বাদশা সালমান এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই পদক্ষেপের ফলে দেশটির শিল্প খাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। নতুন শিল্প কারখানা স্থাপন এবং বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য কী অর্থ বহন করে এই সিদ্ধান্ত
এই সিদ্ধান্তের ফলে সৌদি আরবে কর্মরত লাখো প্রবাসী শিল্প শ্রমিক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন। নিয়োগকর্তাদের ব্যয় কমায় কর্মসংস্থান স্থিতিশীল থাকবে এবং নতুন নিয়োগের সুযোগও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক বার্তা, কারণ শিল্প খাত সৌদি আরবের অন্যতম বড় কর্মসংস্থান ক্ষেত্র।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী ফি বাতিলের ফলে সৌদি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন খরচ কমবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক শিল্প বিনিয়োগকারীদের কাছে সৌদি আরবকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা
সৌদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি তাৎক্ষণিক সুবিধা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ। শিল্প খাতে নীতিগত সহায়তা, কর কাঠামোর সংস্কার এবং শ্রমবাজারকে আরও কার্যকর করার মাধ্যমে সৌদি আরব একটি স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্প অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ সৌদি ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি শক্তিশালী শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করতে সহায়তা করবে।
উপসংহার
শিল্প শ্রমিকদের জন্য প্রবাসী ফি বাতিলের সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শিল্প খাত, বিনিয়োগকারী এবং প্রবাসী শ্রমিক—সবার জন্যই ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব আগামী দিনে সৌদি শিল্প অর্থনীতিতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
