সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলা: আইএস ঘাঁটি লক্ষ্য করে অভিযান, কী বার্তা দিল ওয়াশিংটন?
পশ্চিম এশিয়ায় আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাপ বাড়াল যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান। সিরিয়ায় আইএস (ইসলামিক স্টেট) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর চালানো বিমান হামলা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এই পদক্ষেপ কি শুধুই সীমিত প্রতিশোধ, নাকি বৃহত্তর সংঘাতের ইঙ্গিত?
মার্কিন সামরিক সূত্র অনুযায়ী, শুক্রবার গভীর রাতে সিরিয়ার একাধিক অঞ্চলে আইএস সংশ্লিষ্ট ঘাঁটি লক্ষ্য করে আকাশপথে হামলা চালানো হয়। এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনস্থ যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গি গোষ্ঠীর অবকাঠামো, অস্ত্রভাণ্ডার এবং লজিস্টিক সাপোর্ট ব্যবস্থাকে দুর্বল করা।
হামলার পটভূমি
গত সপ্তাহে সিরিয়ায় কয়েকজন মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই ওয়াশিংটনে চাপ বাড়ছিল। নিহতদের দেহ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছনোর পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, মার্কিন নাগরিকদের উপর হামলার জবাব দেওয়া হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই প্রেক্ষাপটেই সিরিয়ায় আইএস ঘাঁটিতে চালানো হামলাকে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই অভিযান পরিকল্পিত, নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ছিল।
অভিযানের ধরন ও লক্ষ্য
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে আধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে এবং মধ্য সিরিয়ার একাধিক এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। প্রায় ৭০টিরও বেশি সম্ভাব্য আইএস অবস্থান চিহ্নিত করে সেখানে গোলাবর্ষণ করা হয়।
এই হামলার নাম দেওয়া হয়েছে “অপারেশন হকআই স্ট্রাইক”। প্রতিরক্ষা দফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযানের সময় বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত জঙ্গি ঘাঁটিতেই আঘাত হানা হয়েছে।
যুদ্ধ নয়, বার্তা?
হামলার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি ফের পূর্ণমাত্রার সংঘাতে জড়াতে চলেছে? এই জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “এটি কোনও যুদ্ধ ঘোষণার পদক্ষেপ নয়। এটি একটি সীমিত প্রতিশোধমূলক অভিযান, যার লক্ষ্য শুধুমাত্র আইএস জঙ্গি ও তাদের পরিকাঠামো।”
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতেও তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে, তবে অকারণে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়ানোর পরিকল্পনা নেই।
ট্রাম্পের বার্তা
হামলার পর সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, সিরিয়ায় আইএস-এর শক্ত ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, জঙ্গি সংগঠনগুলিকে দুর্বল করা গেলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, সিরিয়ার বর্তমান প্রশাসনের তরফ থেকেও এই অভিযানে নৈতিক সমর্থন পাওয়া গেছে। যদিও আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ এই দাবিকে সতর্কতার সঙ্গে দেখছে।
সিরিয়ার প্রতিক্রিয়া
সিরিয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশটিকে জঙ্গি কার্যকলাপের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে দেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে বিদেশি সামরিক অভিযান নিয়ে সিরিয়ার অভ্যন্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ায় বর্তমানে প্রায় এক হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যারা মূলত প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহযোগিতার কাজে যুক্ত। সাম্প্রতিক হামলা সেই উপস্থিতির কৌশলগত গুরুত্ব আবারও সামনে আনল।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ
পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ কাজ করছে। এই হামলার ফলে আঞ্চলিক শক্তিগুলির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, আইএস এখনও পুরোপুরি দুর্বল হয়নি এবং সুযোগ পেলে তারা পুনরায় সংগঠিত হতে পারে। সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের সীমিত অভিযান ভবিষ্যতেও দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলি সব পক্ষকেই সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা যুদ্ধ চায় না, তবে হুমকি উপেক্ষাও করবে না। সিরিয়ায় আইএস বিরোধী অভিযান সেই নীতিরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
এই হামলা শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় কতটা ভূমিকা রাখবে, নাকি নতুন করে উত্তেজনা বাড়াবে—তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকল।
