বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় অগ্রগতি: ইতালি থেকে ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ কেনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বিমান বাহিনী
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের লক্ষ্য দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা বর্তমান সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ইতালির কাছ থেকে বহুল আলোচিত উন্নত যুদ্ধবিমান ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ ক্রয়ের দিকে বড় এক ধাপ এগিয়েছে। এই অগ্রগতি শুধু সামরিক শক্তির ব্যাপক উন্নয়নই নয়, বরং কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।
৭ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার ঢাকায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে ইতালির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা কোম্পানি লিওনার্দো এসপিএ (Leonardo S.p.A)-র সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ ক্রয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরুর দিকেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইএসপিআর এক বিবৃতিতে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং জানিয়েছে—এটি ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশ হিসেবে এয়ার-টু-এয়ার, এয়ার-টু-গ্রাউন্ড সক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা: উপস্থিত ছিলেন দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো।
অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা ও সামরিক প্রোটোকল মেনে অনুষ্ঠিত হয়।
বিমান বাহিনীর প্রধান এই চুক্তিকে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের একটি “সময়ের দাবি পূরণকারী পদক্ষেপ” হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি জানান, উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান প্রাপ্তি মানে শুধু বিমান বাহিনীর আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, বরং নজরদারি, প্রশিক্ষণ, এবং জরুরি প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করা।
ইতালির রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে এবং এই চুক্তি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
‘ইউরোফাইটার টাইফুন’—এক নজরে অত্যাধুনিক ক্ষমতা
‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফটগুলোর একটি। ইউরোপের চার দেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই যুদ্ধবিমান প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের সব ধরনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য—
-
দ্বৈত ইঞ্জিন সমৃদ্ধ, ফলে উচ্চক্ষমতার উড়ান ও গতিশীলতা নিশ্চিত
-
সুপারসনিক ক্রুজ সক্ষমতা (afterburner ছাড়াই উচ্চগতির উড়ান)
-
এয়ার-টু-এয়ার ও এয়ার-টু-গ্রাউন্ড কমব্যাট ক্ষমতা
-
উন্নত রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও টার্গেটিং সিস্টেম
-
দীর্ঘ দূরত্বে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা
-
আধুনিক মিসাইল সাপোর্ট, যেমন মেটিওর, এএমআরএএএম, ব্রিমস্টোন ইত্যাদি
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত AIR FORCE এই বিমানটি ব্যবহার করে। ফলে বাংলাদেশ যদি পর্যায়ক্রমে এই যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, তবে আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় রূপান্তর দেখা যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
কেন বাংলাদেশ এই বিমানটি বেছে নিতে চায়?
বাংলাদেশ গত এক দশকে প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে Vision 2030 এবং Forces Goal 2030–এর আলোকে বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা সুস্পষ্ট।
কারণগুলো—
-
আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ভারসাম্য
দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলে সামরিক শক্তির পরিমণ্ডল দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য আধুনিক যুদ্ধবিমান প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। -
প্রযুক্তিগত আপগ্রেডেশন
পুরনো বিমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। -
বহুমাত্রিক সামরিক ব্যবহারে সুযোগ
যুদ্ধবিমান শুধু যুদ্ধ নয়, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগকালীন সহায়তা, এবং নন-কমব্যাট মিশনেও ব্যবহৃত হতে পারে। -
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি
ইতালির মতো উন্নত দেশের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং নতুন সম্ভাবনা আনতে পারে।
চুক্তির প্রকৃতি: কেন ‘প্রাথমিক চুক্তি’ বলা হচ্ছে?
আইএসপিআরের বিবৃতি অনুযায়ী এটি একটি প্রাথমিক বা প্রি-এগ্রিমেন্ট, অর্থাৎ এটি পূর্ণাঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি নয়।
সাধারণত বড় সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে একটি দেশের প্রতিরক্ষা বিভাগ বিভিন্ন ধাপে চুক্তি সম্পন্ন করে—
-
প্রাথমিক চুক্তি (Intent / MoU)
-
প্রযুক্তি ও মূল্য পর্যালোচনা (Technical Evaluation)
-
সরকারি অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দ
-
চূড়ান্ত ক্রয় চুক্তি
-
ডেলিভারি, প্রশিক্ষণ ও অপারেশনাল প্রস্তুতি
বাংলাদেশ এখন প্রথম ধাপটি সম্পন্ন করেছে। পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন হলে জানা যাবে কয়টি বিমান, কোন কনফিগারেশন, এবং মোট ব্যয় কত হতে পারে।
এটি কি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কৌশল বদলে দেবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোফাইটার টাইফুন যুক্ত হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা একধাপ এগিয়ে যাবে।
কারণ—
-
উন্নত রাডার প্রযুক্তি
-
দ্রুত আক্রমণ ও প্রতিরোধ ক্ষমতা
-
বাড়তি নিরাপত্তা প্রস্তুতি
-
সীমান্ত স্ক্যানিং সক্ষমতা
এটি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কে আরও শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে।
তবে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়। জেলার ভৌগোলিক অবস্থান, বাজেট, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার দিকগুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশ–ইতালি সম্পর্কের ওপর প্রভাব
ইতালি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী।
এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে—
-
সামরিক সহযোগিতা
-
প্রযুক্তি স্থানান্তর
-
প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উদ্যোগ
—এসব ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
উপসংহার
ইউরোফাইটার টাইফুন ক্রয় প্রক্রিয়ার এই প্রাথমিক চুক্তি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
যদিও এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়, তবুও এটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এখন অপেক্ষা—পরবর্তী মূল্যায়ন, সরকারি অনুমোদন, এবং চূড়ান্ত ক্রয় প্রক্রিয়ার।
চুক্তির সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ আকাশ প্রতিরক্ষায় একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে।
