৩২ ঘণ্টার লড়াই শেষেও বাঁচানো গেল না ছোট সাজিদকে—তানোরের কূপ দুর্ঘটনায় শোকাহত জনপদ


রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট উত্তরপাড়া গ্রামে দুই বছরের শিশু সাজিদকে ঘিরে গত দুই দিন ধরে যেই উদ্বেগ, অপেক্ষা ও আশা চলছিল—সেটির এক বেদনাময় পরিণতি ঘটেছে বৃহস্পতিবার রাতে। পরিত্যক্ত একটি কূপে পড়ে যাওয়ার পর টানা ৩২ ঘণ্টা চেষ্টা করে ফায়ার সার্ভিস শিশুটিকে উদ্ধার করলেও তাকে জীবিত রাখা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্যকর্মীরা রাত ৯টা ৪০ মিনিটে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়, বরং নিরাপত্তা অব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার অভাব আমাদের সমাজে কত বড় বিপর্যয় আনতে পারে তার একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ।

ঘটনার শুরু: একটি অসাবধানী মুহূর্ত

বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে সাজিদ তার মা রুনা খাতুনের সঙ্গে মাঠের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটি চিৎকার—“মা!”—এবং পরের মুহূর্তেই শিশুটি অদৃশ্য হয়ে যায় চোখের সামনে। মা পেছনে ফিরে দেখেন, খড় দিয়ে ঢেকে রাখা পরিত্যক্ত কূপের মুখ ভেঙে নিচে পড়ে গেছে তার শিশু।
শুরু হয় এক বিভীষিকাময় সময়। কিছুক্ষণ পর মা নিচ থেকে ‘মা, মা’ শব্দ শুনতে পান। কিন্তু কূপটি ছিল এত গভীর যে শিশুটির কাছে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে ওঠে।

স্থানীয়রা জানান, গর্তটি আগে ভরাট করা হলেও বৃষ্টিতে মাটি নেমে গিয়ে পুরনো মুখ আবার বের হয়ে আসে। আর এই অদৃশ্য বিপদের মুখেই পড়ে যায় দুই বছরের এই শিশু।

উদ্ধার অভিযান: সময়ের সঙ্গে লড়াই

ঘটনা জানাজানি হতেই তানোর ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও বিশেষায়িত দল যুক্ত হয়। তাদের অভিযান ধাপে ধাপে এগোতে থাকে—

১) প্রথম পর্যায়ের অনুসন্ধান

– ৩৫ ফুট গভীর পর্যন্ত ক্যামেরা নামানো হয়
– কোনো দৃশ্য পাওয়া যায়নি

পরে বুঝতে পারেন, শিশুটি আরও গভীরে চলে গেছে বা মাটি সরে গিয়ে ঢেকে গেছে।

২) গভীর খনন অভিযান

প্রায় ৪৫ ফুট পর্যন্ত মাটি খনন করা হয় সমান্তরাল একটি পথ তৈরি করে। তবে তারপরও শিশুর অবস্থান নির্ণয় করা যাচ্ছিল না। মাটির গঠন, পাশের পুকুর এবং কূপের ভগ্ন অবস্থা এ অভিযানে বাড়তি জটিলতা তৈরি করে।

৩) অক্সিজেন সরবরাহ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

শিশুকে জীবিত রাখার সম্ভাবনা ধরে রেখে কূপে নিয়মিত অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়।
দুটি ট্র্যাক্টর দিয়ে মাটি সরানো হয় এবং একটি এক্সকাভেটর সমান্তরাল পথ তৈরি করে।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, “সকল প্রযুক্তি ও দক্ষতা দিয়ে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য: কঠিন এক উদ্ধার অভিযান

ফায়ার সার্ভিসের রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক মনজিল হক বলেন—
– “৮–১০ ফুট দূরে একটি পুকুর থাকায় খনন খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়, যাতে পানি লিকেজ না হয়।”

ফায়ার সার্ভিসের লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন—
– “২০০ ফুট গভীর কূপে তাৎক্ষণিক উদ্ধার করার প্রযুক্তি বিশ্বের কোথাও নেই। উন্নত দেশেও এ ধরনের উদ্ধার করতে ৭৫–৭৮ ঘণ্টা লাগে। তবুও আমরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব দিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছি।”

এই মন্তব্যগুলোই প্রমাণ করে—এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি উদ্ধার অভিযান, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হতো ঝুঁকি বিবেচনা করে।

উদ্ধার মুহূর্ত: আশার আলো থেকে শোক

বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৭ মিনিটে ফায়ার সার্ভিস শিশু সাজিদকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
সবার মনে তখন একটিই আশা—হয়তো শিশুটি জীবিত আছে।

কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পর মাত্র কয়েক মিনিটেই সব আশা নিভে যায়।
রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে শিশুটিকে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা শেষে ৯টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসকেরা জানান—সাজিদ আর নেই।

চিকিৎসক জানান,
– “শিশুটির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। উদ্ধার হওয়ার বেশ আগেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা।”

এ সংবাদ মানুষের হৃদয়ে গভীর আঘাত হানে।

পরিবারের বেদনা: শোকের মাতম

মা রুনা খাতুন ভেঙে পড়েন। তার চোখে শুধুই শূন্যতা ও অসহায়তা।
তিনি বলেন,
– “গর্তটি খড় দিয়ে ঢাকা ছিল, বুঝতেই পারিনি। যদি জানতাম, কখনোই শিশুকে নিয়ে ওদিকে যেতাম না।”

পুরো গ্রামও যেন শোকে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। শিশুটির কান্নাভরা ডাক—“মা, মা”—এখন মানুষের স্মৃতিতে থেকে গেছে এক বেদনাময় প্রতিধ্বনি হিসেবে।

গর্তটি কেন ছিল বিপজ্জনক?

স্থানীয়রা জানিয়েছেন—
– ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ায় গ্রামের একজন ব্যক্তি গর্তটি করেছিলেন
– পরে সেটি ভরাট করা হয়
– বৃষ্টিতে মাটি নেমে গিয়ে পুরোনো গর্তটি আবার উন্মুক্ত হয়ে পড়ে

এটি দেখায় যে পরিত্যক্ত কূপ বা বোরিং সঠিকভাবে সিল না করা হলে তা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে যেখানে শিশুরা খেলার সময় এমন গর্ত দেখে বা বুঝে উঠতে পারে না।

পুলিশের তথ্য ও করণীয়

তানোর থানার ওসি শাহীনুজ্জামান জানান—
– কূপটির ব্যাস প্রায় পাঁচ ফুট
– গর্তটি অত্যন্ত গভীর ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল
– তদন্ত করে দেখা হবে এমন পরিত্যক্ত গর্ত কিভাবে নজরদারি ছাড়া রয়ে যায়

তিনি আরও বলেন,
“এ ধরনের অব্যবহৃত ও অরক্ষিত গর্ত সিল করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ানো হবে।”

যা শিখতে হবে—ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক বার্তা

শিশু সাজিদের মৃত্যু একটি করুণ ঘটনা, কিন্তু এটি আমাদের জন্য বড় শিক্ষা রেখে যায়—

✔ পরিত্যক্ত কূপ ও বোরিং দ্রুত সিল করা উচিত
✔ স্থানীয় প্রশাসনকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করতে হবে
✔ গ্রামাঞ্চলের মানুষকে সচেতন করতে হবে
✔ যেসব জায়গায় খনন কাজ হয় সেগুলোতে সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে
✔ শিশুদের খেলার মুক্ত স্থানগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিষিদ্ধ করতে হবে

প্রতিটি জীবন মূল্যবান। আর শিশুদের জীবন আরও বেশি সংবেদনশীল ও সুরক্ষার দাবি রাখে।

উপসংহার

৩২ ঘণ্টার কঠোর পরিশ্রম, দেড় দিনের অস্থির অপেক্ষা, এবং হাজার মানুষের প্রার্থনার পরও বাঁচানো গেল না ছোট্ট সাজিদকে।
উদ্ধারকারী দলের নিরলস প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে।
কিন্তু এই দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অবহেলা কখনও কখনও এমন মূল্য দাবি করে যা কোনো পরিবার, কোনো সমাজ কখনও পূরণ করতে পারে না।

সাজিদকে হারানো একটি গ্রামের নয়, বরং সকলের শোক।
এই ঘটনা যেন ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য একটি শক্ত শিক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়—এটাই সবার প্রত্যাশা।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!