এক রাতেই বদলে গেল দিল্লি–ঢাকা সমীকরণ! হঠাৎ কেন তলব বাংলাদেশি হাই কমিশনার
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ার ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমানের বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা—সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক বহুস্তরবিশিষ্ট। কিন্তু দিল্লিতে সাম্প্রতিক এক ঘটনার পর আবারও স্পষ্ট হলো, এই সম্পর্কের ভেতরে টানাপোড়েন এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দিল্লির কূটনৈতিক পরিবেশে ঘটে গেল বড় পরিবর্তন। একদিকে যেখানে বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ হাই কমিশনের আয়োজনে ভারত–বাংলাদেশ মৈত্রীর ইতিহাস স্মরণ করা হচ্ছিল, ঠিক পরদিনই সেই বন্ধুত্বপূর্ণ আবহের মধ্যে ছেদ টেনে বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে তলব করল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিজয় দিবসের ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে গভীর ও বহুমাত্রিক বলে উল্লেখ করেন। তিনি স্মরণ করেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী ভারতীয় সেনাদের কথা এবং দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের বর্তমান ও সাবেক কূটনীতিক, সেনা কর্মকর্তা, গবেষক এবং বিভিন্ন থিংকট্যাংকের প্রতিনিধিরা। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ইতিবাচক বার্তাবাহী।
অনুষ্ঠানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টেও হাই কমিশনার পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে দুই দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু সেই বন্ধুত্বের বার্তা টিকল খুব অল্প সময়ের জন্যই।
পরদিন সকালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশি হাই কমিশনারকে তলব করা হয়। সাউথ ব্লকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁকে একাধিক বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ জানানো হয়। ভারতীয় পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসকে ঘিরে যে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেটিই ছিল তলবের প্রধান কারণ।
ভারতের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের রাজধানীতে কিছু গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই বিক্ষোভ পুলিশি বাধার মুখে মাঝপথেই থেমে যায়, তবুও বিষয়টি দিল্লির কাছে উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এর পাশাপাশি, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার প্রকাশ্য মন্তব্যও ভারতের অসন্তোষের কারণ হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়। বিশেষ করে ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চল সংক্রান্ত কিছু বক্তব্য দিল্লির কাছে ‘উসকানিমূলক’ বলে বিবেচিত হয়েছে। ভারত মনে করে, এই ধরনের মন্তব্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থার জন্য ক্ষতিকর।
ভারতীয় কর্মকর্তারা হাই কমিশনারকে এ কথাও জানান যে, তারা বাংলাদেশে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভারতীয় দূতাবাস ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কোনো রাষ্ট্রের দায়িত্ব—এই বিষয়টি জোর দিয়েই তুলে ধরা হয়।
তলবের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও তলবের ঘটনা ঘটছে, তার ধারাবাহিকতায় এই পদক্ষেপ একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না।
এর আগে ঢাকাও ভারতের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কিছু রাজনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। এই অভিযোগ–প্রতিযোগিতার মধ্যেই দুই দেশের সম্পর্ক আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বন্ধন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থ। অন্যদিকে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও পারস্পরিক সন্দেহ, যা সম্পর্ককে বারবার চাপে ফেলছে।
বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক কূটনীতিকদের উপস্থিতি অনেকের কাছেই আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়েছিল। অনেক পর্যবেক্ষক ভেবেছিলেন, এই ধরনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্মরণ দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলাতে সহায়ক হবে। কিন্তু পরদিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিল, কেবল আবেগ বা অতীত স্মৃতির ওপর ভর করে বর্তমানের জটিল কূটনৈতিক বাস্তবতা সামাল দেওয়া কঠিন।
ভারতের পক্ষ থেকে আবারও বাংলাদেশের জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। দিল্লির মতে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও স্থিতিশীল থাকবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী আবেগ ও প্রতিবেশী দেশ নিয়ে কঠোর বক্তব্যও জনসমর্থন আদায়ের একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এমন মতও রয়েছে বিশ্লেষকদের। এই বাস্তবতায় দুই দেশের সরকারের জন্য ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে, দিল্লিতে এক রাতের ব্যবধানে যে দৃশ্যপট বদলে গেল, তা আবারও মনে করিয়ে দেয়—ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং নিরাপত্তা, রাজনীতি ও আঞ্চলিক স্বার্থের জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে।
বিজয় দিবসের মৈত্রীর আবহ থেকে হাই কমিশনার তলব—এই দ্রুত পরিবর্তন স্পষ্ট করে দেয়, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত সংলাপ, সংযমী ভাষা ও পারস্পরিক আস্থার বিকল্প নেই। তা না হলে অতীতের গৌরবময় ইতিহাস সত্ত্বেও বর্তমানের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কূটনৈতিক মহলে।
