ইসরায়েলের স্বীকৃতিতে নতুন মোড়! সোমালিল্যান্ড ইস্যুতে কড়া বার্তা সৌদি আরবের
লোহিত সাগর ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চল ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইসরায়েল। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ভিন্নমত।
গত শুক্রবার ইসরায়েল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে তারা সোমালিল্যান্ডকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর এই প্রথম কোনো প্রভাবশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত রাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পেল সোমালিল্যান্ড।
সোমালিল্যান্ডের রাজধানী হারগেইসায় এই ঘোষণার পরপরই উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যায়। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদিরাহমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহি এক বিবৃতিতে বলেন, “এই স্বীকৃতি আমাদের জনগণের দীর্ঘ লড়াই ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি। এটি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আরও দেশকে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহিত করবে।
তবে ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে রিয়াদ স্পষ্ট করে জানায়, তারা সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন অব্যাহত রাখবে। সৌদি আরবের মতে, সোমালিয়ার মূল রাষ্ট্র কাঠামোর বাইরে কোনো “সমান্তরাল রাষ্ট্র” গঠনের প্রচেষ্টা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই সোমালিয়া সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। দেশটি মনে করে, একতরফা স্বীকৃতি সোমালিয়া সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে নতুন করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ কেবল সোমালিল্যান্ড ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। লোহিত সাগর ও আশপাশের সামুদ্রিক পথগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দেশ কৌশলগত অবস্থান জোরদার করতে চাইছে।
সোমালিল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থানও এই আগ্রহের একটি বড় কারণ। আফ্রিকার শিং হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি অবস্থিত, যা ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফলে এখানে কূটনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা অনেক দেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, সোমালিয়া সরকার শুরু থেকেই সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের অবস্থান হলো, সোমালিল্যান্ড এখনও সোমালিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসরায়েলের স্বীকৃতিকে তারা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নীতির পরিপন্থী বলে মনে করছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ বা আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। অনেক দেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সরাসরি অবস্থান নিতে সতর্কতা অবলম্বন করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের এই স্বীকৃতি ভবিষ্যতে নতুন কূটনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। একদিকে সোমালিল্যান্ড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে এক ধাপ এগোলেও, অন্যদিকে এটি সোমালিয়া ও তার মিত্রদের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
সৌদি আরবের কড়া অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মনোভাবকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আরব বিশ্বে সোমালিয়ার অখণ্ডতার প্রশ্নটি সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সব মিলিয়ে, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে ইসরায়েল এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। এই সিদ্ধান্ত হর্ন অব আফ্রিকা, লোহিত সাগর অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগামী দিনে আরও দেশ এই ইস্যুতে কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক আলোচনার গতি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর।
