আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান মার্কিন আইনপ্রণেতাদের


বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচজন প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে একটি চিঠি পাঠিয়ে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন কংগ্রেসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই চিঠিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী পাঁচ মার্কিন আইনপ্রণেতা হলেন গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস, বিল হুইজেঙ্গা, সিডনি কামলাগার-ডোভ, জুলি জনসন এবং থমাস আর. সুওজি। তাঁরা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের পাঠানো এই চিঠিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের একটি আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আইনপ্রণেতারা তাঁদের চিঠিতে উল্লেখ করেন, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি—এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তাঁদের মতে, এসব দুর্বলতার সমাধান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর থেকেই হওয়া প্রয়োজন, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে নয়।

চিঠিতে বিশেষভাবে উঠে এসেছে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত সহিংসতার প্রসঙ্গ। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে তাঁরা উল্লেখ করেন, ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে এই আইনপ্রণেতারা স্পষ্ট করে বলেন, এসব হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্টদের ওপর বর্তানো উচিত, কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে সামষ্টিকভাবে দায়ী করে তার রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মতে, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার নীতি মৌলিক মানবাধিকার। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয় অথবা ত্রুটিপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সব দলের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া জনগণের প্রকৃত মতামত ব্যালট বাক্সে প্রতিফলিত হওয়া সম্ভব নয়। একটি দলকে নিষিদ্ধ রাখলে ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে বলে তাঁরা মনে করেন।

আইনপ্রণেতারা এটাও উল্লেখ করেন, গণতন্ত্র প্রতিশোধের রাজনীতির মাধ্যমে নয়, বরং জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। তাঁদের ভাষায়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃত বিচার হওয়া উচিত, কিন্তু তা যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রূপ না নেয়।

চিঠির শেষাংশে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার অথবা ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচিত সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের জনগণের মৌলিক অধিকার হলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের সরকার গঠন করা, যেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে আইনপ্রণেতারা বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশ। গণতান্ত্রিক উত্তরণ, মানবাধিকার রক্ষা এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চিঠি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। যদিও এটি সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ নয়, তবে গণতন্ত্র, নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত এবং তা পুনর্বিবেচনার আহ্বান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আগামী দিনে সরকার এই আহ্বানের প্রতি কীভাবে সাড়া দেয়, সেটিই এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের নজরে রয়েছে।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!