বাংলাদেশ রাজনীতিতে শোকের দিন: না ফেরার দেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। এই খবরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা জানান, মঙ্গলবার ভোরের দিকে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ অসুস্থতার অধ্যায়
খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে একাধিক শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। বয়সজনিত সমস্যা ছাড়াও তাঁর কিডনি, লিভার, হৃদ্যন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গের জটিলতা ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁকে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের নভেম্বর মাসে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।
চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তিনি আর সাড়া দেননি। চিকিৎসা–সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে পরিবারের সদস্যরা সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান নিয়মিতভাবে চিকিৎসার খোঁজখবর রাখছিলেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী নাম। সামরিক শাসক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি প্রথমে পরিচিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজ যোগ্যতায় রাজনীতির শীর্ষে উঠে আসেন। আশির দশকের শুরুতে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই আন্দোলনের সফল পরিণতির পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন
খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সংসদীয় ব্যবস্থা ও বহুদলীয় রাজনীতির চর্চা নতুন গতি পায়। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
তবে তাঁর শাসনামল ছিল বিতর্কমুক্ত নয়। রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন, হরতাল ও ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন এগিয়েছে। তবুও সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন “দেশনেত্রী” এবং একজন আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
কারাবাস ও অসুস্থতা
পরবর্তী সময়ে একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে তাঁকে কারাবাস করতে হয়। এই সময় থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় ও পরবর্তী সময়ে তিনি নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করতেন। বিশেষ ব্যবস্থায় তাঁকে বাসায় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
চলতি বছরের শুরুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসার পর তাঁর স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। দেশে ফেরার পর আবারও শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকে।
শেষ বিদায় ও জানাজা
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খালেদা জিয়ার জানাজা রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে জানানো হবে। জানাজা ও দাফন উপলক্ষে দলীয়ভাবে কয়েক দিনের শোক কর্মসূচি পালন করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষও তাঁর মৃত্যুতে সমবেদনা জানাচ্ছেন।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তিনি ছিলেন এমন এক নেত্রী, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে এসেছেন। তাঁর নেতৃত্ব, সংগ্রাম ও বিতর্ক—সব মিলিয়েই তিনি ছিলেন একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক অধ্যায়।
তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করবে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। বিশেষ করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল কোন পথে এগোয়, সেদিকে এখন সবার দৃষ্টি।
জাতির জন্য একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি
একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষতি নয়, বরং দেশের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। সমর্থক–সমালোচক নির্বিশেষে সবাই স্বীকার করেন, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর ছাপ রেখে গেছেন।
দীর্ঘ সংগ্রাম, ক্ষমতা, বিরোধিতা, কারাবাস ও অসুস্থতার মধ্য দিয়ে কেটেছে তাঁর জীবন। শেষ পর্যন্ত তিনি চলে গেলেন না–ফেরার দেশে। রেখে গেলেন স্মৃতি, বিতর্ক ও একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক অভিজ্ঞ, প্রভাবশালী ও আলোচিত নেত্রীকে হারালো—যাঁর নাম বহু বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উচ্চারিত হবে।
