রাতে কেঁপে উঠল সৌদি আরব! পূর্বাঞ্চলে অনুভূত ৪.৩ মাত্রার ভূমিকম্প


সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে বুধবার গভীর রাতে একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। দেশটির ন্যাশনাল সেন্টার অব মেটিওরোলজি (এনসিএম) জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪.৩। স্থানীয় সময় রাত ২টা বেজে ১১ মিনিটে এই ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়, যা স্বল্প সময়ের জন্য হলেও অনেক বাসিন্দার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

এনসিএম-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৫০ কিলোমিটার গভীরে। গভীর উৎপত্তিস্থলের কারণে ভূমিকম্পটির প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল এবং তা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা অবকাঠামোগত ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সৌদি আরব সাধারণত ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত নয়। তবে দেশটির পূর্বাঞ্চল ও উপসাগরীয় এলাকার কিছু অংশে মাঝে মাঝে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়ে থাকে। ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো আরবিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের মধ্যকার ভূ-গাঠনিক চাপ।

চলতি বছরের শুরুতেই সৌদি আরব ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর আগে এপ্রিল মাসে আরব সাগরে সৌদি সীমান্তের কাছে একই মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। সে সময় সৌদি আরবের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বলা হয়, আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের পুরোনো ফল্ট লাইনে সৃষ্ট চাপ থেকেই ভূমিকম্পটির উৎপত্তি।

বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, আরবিয়ান প্লেট ধীরে ধীরে উত্তর দিকে সরে ইউরেশিয়ান প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় ভূত্বকের ভেতরে চাপ জমা হয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকম্পের মাধ্যমে মুক্তি পায়। যদিও এই অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম, তবুও মাঝারি মাত্রার কম্পন মাঝে মাঝে অনুভূত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

সৌদি আরবের আশপাশের দেশগুলো, বিশেষ করে ইরান, ইরাক ও ওমান, ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। ইরানে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা কখনো কখনো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও অনুভূত হয়। ইরাকেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক মাঝারি ও শক্তিশালী ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে।

চলতি বছরের ২২ নভেম্বর ইরাকে ৫.০ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়। এর আগে ৪ নভেম্বর ওমানের মুসানদামের দক্ষিণ দিকে ৪.৬ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। ১ ডিসেম্বর বাহরাইনে ৩.৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়। আগস্ট মাসে ওমানের মাদহা অঞ্চলে ২.২ মাত্রার একটি ছোট ভূমিকম্প আঘাত হানে।

এই ধারাবাহিক ভূকম্পনের ঘটনাগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার দিকেই ইঙ্গিত করে। যদিও এসব ভূমিকম্পের অধিকাংশই ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়নি, তবুও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নিয়মিতভাবে ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। দেশটির আধুনিক অবকাঠামো এবং নির্মাণমান ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক বলে মনে করা হয়।

এনসিএম-এর পক্ষ থেকে নাগরিকদের আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভূমিকম্প সংক্রান্ত গুজব বা যাচাই-বিহীন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও সচেতনতার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সবশেষে বলা যায়, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে সংঘটিত এই ৪.৩ মাত্রার ভূমিকম্প বড় কোনো ক্ষতির কারণ না হলেও এটি অঞ্চলটির ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার একটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া ঘটনা। ভবিষ্যতেও এ ধরনের হালকা বা মাঝারি কম্পন ঘটতে পারে—এমন সম্ভাবনা মাথায় রেখে সতর্কতা ও প্রস্তুতি বজায় রাখাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত পদক্ষেপ।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!