গভীর নলকূপের পরিত্যক্ত গর্তে আটকে শিশু সাজিদ: ৪০ ফুট খনন শেষে মূল উদ্ধার অভিযান শুরু
রাজশাহীর তানোর উপজেলা বর্তমানে এক গভীর উৎকণ্ঠার নাম। গ্রাম থেকে শহর—সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন দুই বছরের শিশু সাজিদকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া দুর্ঘটনা এবং তাকে জীবিত উদ্ধারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। বুধবার দুপুরে একটি পরিত্যক্ত গর্তে পড়ে যাওয়া শিশুটিকে উত্তোলনের জন্য ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট রাতভর পরিশ্রম করছে। বৃহস্পতিবার সকাল নাগাদ উদ্ধারকারী দল মূল গর্তের খুব কাছ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মূল উদ্ধার অভিযান। পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যাশা—সাজিদ যেন নিরাপদে মায়ের কোলে ফিরে আসতে পারে।
ঘটনার শুরু: মায়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতেই দুর্ঘটনা
১০ ডিসেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে সাজিদ তার মায়ের হাত ধরে কেটে নেয়া ধানের খেতে হাঁটছিল। এমন সময় অদৃশ্য ঝুঁকির মতো থাকা পুরনো একটি গভীর গর্ত তার পায়ের নিচে ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই সে গর্তের গভীরে তলিয়ে যায়। দুই বছরের শিশুর জন্য এমন গর্ত ছিল ভয়াবহ ফাঁদ, যা পরিবার কিংবা আশপাশের কেউ আগেই বুঝতে পারেনি।
শিশুটি রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাকিবের ছেলে। রাকিব ঢাকার একটি জুট মিলে ব্যবস্থাপক পদে চাকরি করেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনিও জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা থেকে রওনা হন। শিশুটির মা ঘটনার পর থেকেই শোকে ভেঙে পড়েছেন। তাকে বারবার স্বজনরা সান্ত্বনা দিলেও তিনি সন্তানের অবস্থার জন্য দুশ্চিন্তায় স্থির থাকতে পারছেন না।
কীভাবে তৈরি হয়েছিল বিপজ্জনক গর্তটি?
স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, গত বছর কোয়েলহাট গ্রামের কছির উদ্দিন তার জমিতে পানির স্তর পরীক্ষা করতে একটি গভীর নলকূপের গর্ত খনন করেছিলেন। পরে তা ভরাট করা হলেও বর্ষায় জমির মাটি ধসে গিয়ে আবারও সেখানে একটি গভীর ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। গর্তটি ছিল আনুমানিক ৩০–৩৫ ফুট গভীর। বর্ষার পর গর্তটি আবার বড় হয়ে পড়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তবে স্থানীয় কেউই ধারণা করতে পারেননি যে এটি এত ভয়াবহভাবে খোলা অবস্থায় পড়ে আছে।
বর্তমানে এ এলাকায় নতুন করে গভীর নলকূপ বসানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, কারণ এখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। ফলে এ ধরনের পরিত্যক্ত গর্ত স্থানীয়দের জীবনে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
উদ্ধার অভিযান: ৪০ ফুট পাশ দিয়ে খনন শেষে মূল অপারেশন
ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। শুরুতে দমকল সদস্যরা শিশুটির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। প্রথম দিকে কিছুটা শব্দ পাওয়া গেলেও পরে তা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। শিশুটি গর্তে কতটুকু গভীরে আটকে আছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে দলটি ভেতরে ক্যামেরা নামানোর চেষ্টা করে।
পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হয় গর্তের পাশে নতুন করে একটি প্রশস্ত খাল বা টানেল খনন করে নিচ থেকে শিশুর কাছে পৌঁছানো হবে। তিনটি এসকেভেটর দিয়ে দ্রুত মাটি কেটে প্রায় ৪০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত পৌঁছানো হয়। এই পর্যায়টা ছিল সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ, কারণ গর্তের চারপাশের মাটি বেশ ঢিলা ছিল। হঠাৎ ধস নামার ঝুঁকি থাকায় প্রতিনিয়ত মাটি সরানোর গতি নিয়ন্ত্রণ করে সতর্কতার সঙ্গে কাজ চালানো হয়।
বুধবার সন্ধ্যা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। এমন ভিড় উদ্ধার কাজে বাধা সৃষ্টি করছিল। ফলে প্রশাসন বাধ্য হয় লোকজনকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে অনুরোধ করতে। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলে উদ্ধার কাজ দ্রুত গতিতে শুরু হয়।
উদ্ধারকারীদের বক্তব্য: ‘যত দ্রুত সম্ভব জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চাই’
রাজশাহী বিভাগের ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক দিদারুল আলম গণমাধ্যমকে জানান, ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ অনুযায়ী শিশুটিকে জীবিত উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন:
"এটি অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ একটি উদ্ধার অভিযান। তবে আমরা সর্বশেষ প্রযুক্তি ও সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করছি। আশা করছি খুব শিগগিরই শিশুটির অবস্থানে পৌঁছাতে পারব।"
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরাও উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করছেন। ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে যাতে শিশুটিকে উদ্ধার করা মাত্রই দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
জনমনে উদ্বেগ: প্রার্থনায় সবাই
ধানের খেতের মাঝখানে ছোট একটি পরিত্যক্ত গর্ত যে এত বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে তা কেউই ভাবতে পারেনি। চারপাশের মানুষ শিশুটির জন্য প্রার্থনা করছেন। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ—স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, সাধারণ গ্রামবাসী, শিক্ষার্থী—সকলেই এক হয়ে শিশুটির নিরাপদ উদ্ধারের অপেক্ষায়।
গ্রামবাসীর একজন বলেন:
"আমরা সারারাত জেগে দেখেছি। দমকল কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। আল্লাহ যেন শিশুটিকে বাঁচিয়ে দেন, এটাই আমাদের কামনা।"
নিরাপত্তা ও সচেতনতার প্রশ্ন
এ দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিলো—পরিত্যক্ত ও খোলা গর্ত কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ শিশুদের জন্য। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ বা পরীক্ষামূলক খননের কারণে ভূমিতে খোলা গর্ত দেখা যায়। এগুলো সময়মতো ভরাট না করলে বা ঘিরে না রাখলে এ ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকে যায়।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, উদ্ধারকাজ শেষ হলে পুরো এলাকাজুড়ে এমন গর্ত শনাক্ত করে পূর্ণাঙ্গভাবে ভরাট করা হবে।
শেষ কথা
রাজশাহীর তানোরে দুই বছরের শিশু সাজিদের এই ঘটনা গোটা দেশের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। একটি ছোট অবহেলা বা অসম্পূর্ণ কাজ কীভাবে বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে—এটি তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। এখন কেবলই অপেক্ষা, উদ্ধারকারী দল যেন দ্রুত শিশুটির কাছে পৌঁছাতে পারে এবং তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে পারে।
মানবতার এই মুহূর্তে সবাই এক সুরে বলছে—
“সাজিদকে জীবিত ফেরত চাই।”
