যুক্তরাষ্ট্র নয়, সবচেয়ে বেশি ভারতীয়কে বিতাড়িত করেছে সৌদি আরব!


বিশ্বজুড়ে অভিবাসন নীতি যখন দিন দিন কঠোর হচ্ছে, তখন ভারতীয় নাগরিকদের বিতাড়নের পরিসংখ্যান নিয়ে সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সাম্প্রতিক সরকারি উপাত্ত অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি ভারতীয় নাগরিককে বিতাড়িত করেছে সৌদি আরব। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এই তথ্য আন্তর্জাতিক অভিবাসন পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে ভারতীয় নাগরিকদের আটক ও বিতাড়নের তথ্য সংসদে লিখিত উত্তরের মাধ্যমে তুলে ধরেন ভারতের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবই এই সময়কালে ভারতীয়দের সবচেয়ে বেশি বিতাড়নকারী দেশ হিসেবে শীর্ষে রয়েছে।

সরকারি হিসাব বলছে, ২০২১ সালে সৌদি আরব থেকে বিতাড়িত হন ৮,৮৮৭ জন ভারতীয় নাগরিক। পরের বছর ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০,২৭৭ জনে। ২০২৩ সালে বিতাড়নের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১১,৪৮৬ জন। যদিও ২০২৪ সালে কিছুটা কমে ৯,২০৬ জনে দাঁড়ায়, তবে ২০২৫ সালে (এখন পর্যন্ত) ইতোমধ্যে ৭,০১৯ জন ভারতীয় নাগরিক সৌদি আরব থেকে বিতাড়িত হয়েছেন।

এই পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের চিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি তুলনামূলকভাবে কঠোর হলেও, সেখানে ভারতীয়দের বিতাড়নের সংখ্যা সৌদি আরবের তুলনায় অনেক কম। ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক ভারতীয় মিশনের তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত হন ৮০৫ জন ভারতীয়। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮৬২ জন এবং ২০২৩ সালে নেমে আসে ৬১৭ জনে।

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়নের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১,৩৬৮ জনে। ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ৩,৪১৪ জন ভারতীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। তবুও মোট হিসাব করলে সৌদি আরবের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের মধ্যে ওয়াশিংটন ডিসি থেকে বিতাড়নের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া হিউস্টন থেকে ২৩৪ জন ভারতীয় নাগরিককে বিতাড়িত করা হয়েছে। অন্য শহরগুলো যেমন নিউইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকো, আটলান্টা ও শিকাগোতে বিতাড়নের সংখ্যা সাধারণত দুই অঙ্ক বা কম শতকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিদেশে ভারতীয় নাগরিকদের আটক বা বিতাড়নের পেছনে বেশ কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ভিসা বা রেসিডেন্সি কার্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা। এছাড়া বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করা, শ্রম আইন লঙ্ঘন, নিয়োগকর্তার কাছ থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করা এবং দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলায় জড়ানোর ঘটনাও বিতাড়নের বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় শ্রমিক কাজ করেন। নির্মাণ, গৃহস্থালি, পরিবহন ও পরিষেবা খাতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, স্থানীয় আইন ও অভিবাসন নীতির কঠোর প্রয়োগ অনেক সময় তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা এবং দালালনির্ভর অভিবাসন ব্যবস্থাই এসব সমস্যার অন্যতম কারণ।

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অন্যান্য দেশ থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় নাগরিককে বিতাড়িত করা হয়েছে। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, মিয়ানমার থেকে ১,৫৯১ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১,৪৬৯ জন, মালয়েশিয়া থেকে ১,৪৮৫ জন এবং বাহরাইন থেকে ৭৬৪ জন ভারতীয় নাগরিককে বিতাড়িত করা হয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ড থেকে ৪৮১ জন এবং কম্বোডিয়া থেকে ৩০৫ জন ভারতীয় নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা ও কল্যাণ সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখে। কোনো দেশে ভারতীয় নাগরিক আইনি জটিলতায় পড়লে বা আটক হলে, সংশ্লিষ্ট ভারতীয় মিশন প্রয়োজন অনুযায়ী কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। প্রয়োজনে স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিদেশে কাজ করতে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা নীতি, শ্রম আইন ও অভিবাসন নিয়ম ভালোভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বৈধ চ্যানেলে কাজ নেওয়া এবং নিয়মিত কাগজপত্র হালনাগাদ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র নয় বরং সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় নাগরিক বিতাড়নের তথ্য আন্তর্জাতিক অভিবাসন বাস্তবতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ভবিষ্যতে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!