প্রবাসী আয়ে আবার শীর্ষে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র নেমে গেল পঞ্চম স্থানে
দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আবারও আগের স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষে থাকা সৌদি আরব পুনরায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রবাসী আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে তালিকায় যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র নেমে গেছে পঞ্চম স্থানে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ১ হাজার ৩০৩ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এই সময়ের দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সৌদি আরব থেকেই এসেছে সর্বোচ্চ ২০৫ কোটি ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী আয়ের এই পরিবর্তিত চিত্র মূলত দুটি কারণে ঘটেছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্স প্রেরণের উৎস দেশ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আগে যে বিভ্রান্তি ছিল, সেটি এখন অনেকটাই সংশোধন করা হয়েছে।
গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক সময় যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের শীর্ষ উৎস। তবে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা আয়ের বড় অংশই ছিল অন্য দেশ থেকে পাঠানো অর্থ, যা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে পাঠানো হতো। ফলে উৎস দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম দেখানো হলেও প্রকৃত উৎস ছিল ভিন্ন।
এই ত্রুটি সংশোধনের পর এখন দেশভিত্তিক প্রবাসী আয়ের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে চলতি অর্থবছরের পরিসংখ্যানে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যেখান থেকে এসেছে ১৬৭ কোটি ডলার। তৃতীয় স্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ১৫৮ কোটি ডলার। এরপর রয়েছে মালয়েশিয়া, দেশটি থেকে এসেছে ১৪৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ১০৩ কোটি ডলার, যা আগের তুলনায় কম হলেও এখনো উল্লেখযোগ্য। তালিকার পরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালি (৮৩ কোটি ডলার), ওমান (৭৭ কোটি ডলার), কুয়েত (৬৪ কোটি ডলার), কাতার (৫৯ কোটি ডলার) এবং সিঙ্গাপুর (৫৫ কোটি ডলার)।
বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের দিক থেকে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষে। দেশটিতে মূলত নির্মাণ, পরিষেবা, পরিবহন ও বিভিন্ন শ্রমঘন খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করছেন। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার ও বাহরাইনে বাংলাদেশি কর্মীদের উপস্থিতি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে মূলত শিক্ষার্থী, দক্ষ পেশাজীবী এবং স্থায়ীভাবে বসবাসরত বাংলাদেশিরা প্রবাসী আয়ের বড় উৎস হিসেবে কাজ করছেন। ফলে এসব দেশ থেকে নিয়মিত ও তুলনামূলক স্থিতিশীল রেমিট্যান্স আসছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আশাব্যঞ্জক। শুধু নভেম্বর মাসেই রাষ্ট্র মালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংক দেশে এনেছে ৫৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং কৃষি ব্যাংক এনেছে ২৯ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এনেছে ১৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো এনেছে ৫৯ লাখ ডলার।
এর আগের দুই অর্থবছরের চিত্রও উল্লেখযোগ্য। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল। আর ২০২৩–২৪ অর্থবছরে এসেছিল ২ হাজার ৩৯১ কোটি ডলার।
বিশেষ করে গত মার্চ মাসে একক মাস হিসেবে রেকর্ড ৩২৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় আসে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এই রেকর্ড প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা চলতি অর্থবছরেও বজায় থাকবে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
চলতি ডিসেম্বর মাসের প্রথম ১৭ দিনেই প্রবাসীরা ২০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে মাস শেষে প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক প্রবাহের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। দীর্ঘদিন পর ডলারের সংকট অনেকটাই কেটে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে।
ব্যাংকারদের মতে, নিয়মিত রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি আয় এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে ডলার বিক্রি ও কেনার ফলে রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটি দেশের আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক সংকেত।
সব মিলিয়ে, প্রবাসী আয়ের বর্তমান চিত্র বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আবারও প্রবাসী আয়ের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো থেকেও স্থিতিশীল আয় আসছে, যা ভবিষ্যতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
