মরুভূমিতে বরফ! সৌদি আরবে প্রকৃতির বিরল উলটপুরাণে স্তব্ধ বিশ্ব
সৌদি আরব মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উত্তপ্ত বালিয়াড়ি, অনাবৃষ্টি আর প্রখর সূর্যের ছবি। বছরের পর বছর ধরে এই দেশটি পরিচিত তার চরম শুষ্ক আবহাওয়ার জন্য। কিন্তু প্রকৃতি যে কখন কোন রূপ দেখাবে, তা আগাম বোঝা সব সময় সম্ভব নয়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যে দৃশ্য দেখা গেল, তা সেই কথাই আবার প্রমাণ করল।
তাবুক অঞ্চলের একাধিক এলাকায় হঠাৎ করেই শুরু হয় তুষারপাত। মরুভূমির বাদামি বালির উপর ধীরে ধীরে জমতে থাকে সাদা বরফের চাদর। রাস্তা, পাহাড়, খোলা প্রান্তর—সব কিছু ঢেকে যায় শুভ্র আবরণে। সাধারণত যেখানে দিনের বেলায় তাপমাত্রা থাকে অত্যন্ত বেশি, সেখানে হিমাঙ্কের নিচে নেমে আসে পারদ। স্থানীয় বাসিন্দারা অনেকেই জীবনে প্রথমবার এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন।
এই তুষারপাতের ভিডিও ও ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি এই দৃশ্য বাস্তব। কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, এটি হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিও। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং আবহাওয়া দফতরের নিশ্চিতকরণের পর স্পষ্ট হয়—ঘটনাটি সম্পূর্ণ বাস্তব এবং বিরল।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই তুষারপাতের পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। উপরের স্তরের বাতাসের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়া, আর্দ্রতার প্রবাহ বৃদ্ধি, বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন এবং ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রার দ্রুত পতন—এই সব কিছুর সম্মিলিত ফলেই মরুভূমিতে তুষারপাত সম্ভব হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি খুব কম ক্ষেত্রেই তৈরি হয়।
তাবুক অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক উঁচুতে অবস্থিত। ফলে শীতকালে এখানকার তাপমাত্রা সৌদি আরবের অন্যান্য অংশের তুলনায় কিছুটা কম থাকে। অতীতেও এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে তুষারপাতের ঘটনা ঘটেছে। তবে এবারের তুষারপাতের বিস্তৃতি এবং তীব্রতা আগের ঘটনাগুলির তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
রাস্তাঘাটে জমে থাকা বরফের কারণে সাময়িকভাবে যান চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষ করে পাহাড়ি ও উঁচু এলাকাগুলিতে অপ্রয়োজনে যাতায়াত না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। জরুরি পরিষেবাগুলিকে প্রস্তুত রাখা হয় সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আবহাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের মতে, এটি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিতও হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে চরম ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও তীব্র তাপপ্রবাহ, আবার কোথাও অসময়ে তুষারপাত—সব মিলিয়ে প্রকৃতির আচরণ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
এর আগেও মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু মরু অঞ্চলে তুষারপাতের নজির রয়েছে। সাহারা মরুভূমিতে গত কয়েক দশকে একাধিকবার বরফ পড়েছে, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সৌদি আরবেও ২০১৬, ২০২২ এবং ২০২৪ সালে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে তুষারপাত দেখা গিয়েছিল। তবে প্রতিবারই এই ঘটনাগুলি ছিল স্বল্পস্থায়ী এবং সীমিত এলাকার মধ্যে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মরু অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র এই ধরনের আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে স্থানীয় উদ্ভিদ, প্রাণী এবং মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে। যদিও তুষারপাত কিছু সময়ের জন্য সৌন্দর্য তৈরি করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নিয়ে চিন্তিত পরিবেশবিদেরা।
সৌদি আরবের জাতীয় আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ভবিষ্যতেও শীতকালে কিছু অঞ্চলে অস্বাভাবিক আবহাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই আগাম সতর্কতা এবং পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে নিয়মিত আবহাওয়ার আপডেট অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মরুভূমিতে বরফ পড়ার এই দৃশ্য একদিকে যেমন বিস্ময় জাগিয়েছে, তেমনই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে। প্রকৃতির এই উলটপুরাণ হয়তো সাময়িক, কিন্তু এর বার্তা গভীর। বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুষ্ক বালির রাজ্যে সাদা বরফের এই অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি তাই শুধু একটি দৃশ্য নয়, বরং সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত—যেখানে প্রকৃতি নিজেই জানিয়ে দিচ্ছে, পরিবর্তন অনিবার্য।
