চেহারা বদলে ৮ মাস আত্মগোপনে! সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের অজানা গল্প


সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ আত্মগোপনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় একজন পরিচিত মুখ কীভাবে সম্পূর্ণ অচেনা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রায় আট মাস ধরে তিনি দেশে আত্মগোপনে ছিলেন বলে দাবি করেছেন, যা ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ড. মোমেন জানান, আত্মগোপনে থাকার সময় নিজের পরিচয় গোপন রাখতে তিনি শারীরিকভাবে বড় পরিবর্তন আনেন। আগে যাঁরা তাঁকে চিনতেন, তাঁদের চোখ এড়াতেই তিনি দাড়ি রাখেন এবং চুলের স্টাইল বদলে ফেলেন। নিয়মিত কোনো সেলুনে না গিয়ে তিনি বাসাতেই নাপিত ডেকে চুল ও দাড়ি কাটাতেন, যেন বাইরের কেউ তাঁকে শনাক্ত করতে না পারে। তাঁর ভাষায়, “এই পরিবর্তনটা আমার জন্য প্রয়োজন ছিল নিরাপত্তার স্বার্থেই।”

অবস্থান গোপন রাখতে প্রযুক্তিগত দিকেও ছিলেন সতর্ক। তিনি বলেন, আত্মগোপনের পুরো সময়ে অন্তত ছয়বার মোবাইল ফোনের সিম পরিবর্তন করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট নম্বর দীর্ঘদিন ব্যবহার করেননি। পরিচিতজনদের সাথেও সীমিত যোগাযোগ রেখেছেন, যাতে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত তথ্য না পায়।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—তিনি আত্মীয়স্বজন বা ঘনিষ্ঠ পরিচিতদের বাসায় আশ্রয় নেননি। বরং সাধারণ মানুষের ভাড়া বাসায় থেকেছেন, যেখানে তাঁকে চিনে ফেলার সম্ভাবনা কম ছিল। একটি গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর বায়ারদের জন্য রাখা খালি বাসায় দীর্ঘ সময় কাটানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই ধরনের বাসাগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল এবং সেখানে অপ্রয়োজনীয় কৌতূহলও কম।

সাক্ষাৎকারে ড. মোমেন দাবি করেন, তিনি ছিলেন “দেশ ছাড়ার ক্ষেত্রে শেষ দিকের একজন।” তাঁর ভাষায়, “আই ওয়াজ দ্য লাস্টম্যান টু লিভ দ্য কান্ট্রি।” দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না বলেও জানান তিনি। শুরুতে তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকায় দেশে থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। কারণ, তাঁর দাবি অনুযায়ী, তিনি কারো ক্ষতি করেননি কিংবা কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার কারণে শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন তিনি। এ ক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তা এবং কিছু সরকারি কর্মকর্তার সহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন ড. মোমেন। যদিও ঠিক কোন সীমান্ত দিয়ে বা কী প্রক্রিয়ায় তিনি দেশ ত্যাগ করেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “আমি বিমানবন্দরের ধারেকাছেও যাইনি। এটি পালাইয়া আসা—সরকারি লোকেরাই আমাকে সাহায্য করেছে।” এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে, যদিও তিনি বিষয়টিকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করেন।

বর্তমানে ড. এ কে আব্দুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। সেখানে তিনি পরিবার নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন বলে জানা গেছে। ভবিষ্যতে দেশে ফেরার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে ভুলেননি তিনি।

সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমি দেশটাকে জঙ্গি দেশ বানাতে চাই না। দেশ বাঁচাতে হলে সবাইকে একসাথে উদ্যোগ নিতে হবে।” তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে কাজ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

নিজের দীর্ঘ আত্মগোপনের অভিজ্ঞতাকে তিনি খানিকটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। হালকা হাসির সঙ্গে বলেন, এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ যেন একটি সিনেমার গল্পের মতো। তাঁর ভাষায়, “এই গল্প দিয়ে সুন্দর একটা মুভি বানানো যায়।” তবে সেই ‘সিনেমাটিক’ জীবনের প্রতিটি দিন যে অনিশ্চয়তা আর মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে কেটেছে, সেটিও স্পষ্ট করেছেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ড. মোমেনের এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে। একজন সাবেক শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির আত্মগোপনের অভিজ্ঞতা দেশের রাজনীতির জটিলতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

সব মিলিয়ে, ড. এ কে আব্দুল মোমেনের আত্মগোপনের গল্প শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং ক্ষমতার পালাবদলের পরিণতি নিয়েও ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে। সামনে এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে কী প্রতিক্রিয়া আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!