সৌদির চাপ, ঢাকার সময় চাওয়া: ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা পাসপোর্ট নিয়ে কোন পথে বাংলাদেশ?


সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার প্রক্রিয়াটি এখন বাংলাদেশের জন্য একটি সংবেদনশীল কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার আগামী মার্চ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় চেয়েছে।

এই পাসপোর্ট বিতরণ উদ্যোগটি শুধু একটি কাগজপত্র সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক মানবিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

কেন এই পাসপোর্ট ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ

১৯৭৭ সালের দিকে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার ও তৎকালীন অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বহু রোহিঙ্গা সৌদি আরবে আশ্রয় নেয়। সৌদি সরকার দীর্ঘদিন ধরেই তাদের “বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী” হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে এবং তাদের বৈধ অবস্থান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়।

এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সরকার শর্তসাপেক্ষে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দিতে সম্মত হয়। শর্ত অনুযায়ী, এসব পাসপোর্টধারী ব্যক্তি কখনও বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন না; কেবল সৌদি আরবে বৈধভাবে অবস্থানের জন্যই এই পাসপোর্ট ব্যবহার করা যাবে।

নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণ

চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যেই পাসপোর্ট হস্তান্তর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম পাসপোর্ট বিতরণ করা গেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের দৈনিক সক্ষমতা থাকলেও আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ নির্ধারিত দিনে হাজির হচ্ছেন না। অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকা সত্ত্বেও অনুপস্থিতির হার প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা পুরো প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিয়েছে।

অনুপস্থিতির পেছনের কারণ কী

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাসপোর্ট গ্রহণের পর সৌদি সরকার ভবিষ্যতে মাসিক ফি বা অতিরিক্ত লেভি আরোপ করতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকেই অনেক রোহিঙ্গা আবেদনকারী কনস্যুলেটে আসছেন না। কেউ কেউ আবার কাজ হারানোর ভয় বা আর্থিক চাপের আশঙ্কায় নিজেকে আড়ালে রাখছেন।

এ ছাড়া মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালচক্রের ভুল তথ্যও আবেদনকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব কারণে এসএমএস বা ফোন করেও অনেককে কনস্যুলেটে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

অগ্রগতি ও পরিসংখ্যানের চিত্র

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাসপোর্ট প্রিন্ট ও হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ৬৯ হাজারের লক্ষ্য পূরণে এখনও অনেক পথ বাকি।

ঢাকায় প্রিন্টিং প্রক্রিয়া, সৌদি কর্তৃপক্ষের যাচাই এবং কনস্যুলেটে উপস্থিতি— এই তিন ধাপে সামান্য বিলম্ব হলেও পুরো কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়ছে।

কূটনৈতিক চাপ ও শ্রমবাজার বাস্তবতা

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। দেশটিতে প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। এই বিশাল শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যুতে সৌদি সরকারের চাপ উপেক্ষা করা হলে তা ভবিষ্যতে শ্রমবাজার, ভিসা নীতি কিংবা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই সরকার বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করছে।

নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন

এত বড় পরিসরে পাসপোর্ট বিতরণ প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভুল তথ্য, পরিচয় বিভ্রান্তি বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকলে তা ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুততার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত না করলে এই প্রক্রিয়া দেশের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে দালালচক্র বা অবৈধ সুবিধাভোগীদের সুযোগ তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

সরকারের অবস্থান

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করতে তারা বিশেষ টিম পাঠিয়েছে এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশন পূর্ণোদ্যমে কাজ করছে। সৌদি সরকারকেও অনুপস্থিতির বিষয়টি জানানো হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক নীতি, মানবাধিকার এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেই পাসপোর্ট হস্তান্তর কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন কৌশলগত সুযোগ, অন্যদিকে তেমনি সতর্কতার বিষয়। রোহিঙ্গাদের বৈধতা দেওয়া মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে, তবে শর্তাবলি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি স্পষ্ট ও মানবিক হতে হবে।

তারা বলছেন, অনুপস্থিতির হার কমাতে আবেদনকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা জরুরি। পাসপোর্ট গ্রহণের পর তাদের অধিকার ও দায়বদ্ধতা কী হবে— সে বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য দিলে অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

মার্চ পর্যন্ত সময় চাওয়ার পর এই সময়ের মধ্যেই সরকারকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে—
প্রথমত, অনুপস্থিত আবেদনকারীদের আস্থা ফেরানো।
দ্বিতীয়ত, তথ্য যাচাই ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত, সৌদি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাস্তবসম্মত সময়সূচি বাস্তবায়ন।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবে অবস্থানরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার পাসপোর্ট ইস্যু এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি কূটনীতি, শ্রমবাজার এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির এক জটিল সমীকরণ। এই সমীকরণ কতটা সফলভাবে সমাধান করা যায়, তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের বহু কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!