মায়ের চোখের আড়ালে এক মুহূর্ত, ট্রেনে ঝরে গেল আড়াই বছরের প্রাণ | হৃদয়বিদারক ঘটনা


চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় একটি সাধারণ দুপুর মুহূর্তেই রূপ নেয় চরম হৃদয়বিদারক ঘটনায়। মায়ের হাতে ভাত খাচ্ছিল আড়াই বছর বয়সী শিশু আইমান সামির। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, সেই শান্ত মুহূর্তের পরই একটি পরিবারের সমস্ত সুখ নিমিষেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।

রোববার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে আলমডাঙ্গা উপজেলার পশুহাট সংলগ্ন রেললাইনে ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। আইমান সামির আলমডাঙ্গা উপজেলার মির ইউনিয়নের বেলগাছি ইউনিয়নের দোয়ারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সোহাগ আলীর একমাত্র সন্তান। জীবিকার তাগিদে রেললাইনের পাশেই বসত গড়ে তুলেছিলেন সোহাগ আলী ও তার পরিবার। সেই রেললাইনই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনাটি

প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দুপুরের খাবারের সময় শিশুটিকে বাড়ির সামনের রেললাইনের পাশে বসিয়ে ভাত খাওয়াচ্ছিলেন তার মা। খাওয়ানোর এক পর্যায়ে পানি আনতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘরের ভেতরে যান তিনি। ঠিক সেই সময় দূর থেকে ট্রেনের শব্দ কানে আসে আইমানের। শিশুসুলভ কৌতূহলে সে মায়ের কোল থেকে নেমে দৌড়ে রেললাইনের দিকে চলে যায়।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা খুলনাগামী ‘সুন্দরবন এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি দ্রুতগতিতে ওই লাইনে পৌঁছে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রেনের নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয় শিশুটি। আশপাশের লোকজন ছুটে এলেও ততক্ষণে সব শেষ। ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হয়।

এলাকায় শোকের ছায়া

এই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দোয়ারপাড়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতের বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন ও উৎসুক জনতা। কান্নায় ভেঙে পড়েন শিশুটির মা–বাবা। একমাত্র সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারটি। প্রতিবেশীরা জানান, আইমান ছিল খুব চঞ্চল ও হাসিখুশি শিশু। তাকে ছাড়া বাড়িটা এখন নিস্তব্ধ।

রেলওয়ে পুলিশের বক্তব্য

চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জগদীশ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শিশু আইমান সামির রেললাইনের পাশে অবস্থান করছিল। অসাবধানতাবশত দ্রুতগতির সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে পড়ে তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পেছনের বাস্তবতা

বাংলাদেশের অনেক এলাকায় রেললাইনের খুব কাছাকাছি মানুষের বসবাস একটি সাধারণ চিত্র। নিরাপদ বিকল্প না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এসব পরিবার দিন কাটায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। সামান্য অসতর্কতা যে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, আইমান সামির মৃত্যু তারই নির্মম উদাহরণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেললাইনের পাশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি সচেতনতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জরুরি। শিশুদের সবসময় নজরদারিতে রাখা, রেললাইন থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

সামাজিক ও মানবিক দিক

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়, এটি পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় ছোট ছোট ঝুঁকিকে অবহেলা করি। কিন্তু একটি মুহূর্তের অসচেতনতাই হয়ে উঠতে পারে আজীবনের কান্না।

শিশু নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো মনে করছে, রেললাইনের আশপাশে বসবাসকারী শিশুদের জন্য আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা উচিত। প্রয়োজনে স্থানীয় পর্যায়ে বেড়া, সতর্ক সংকেত ও জনসচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা যেতে পারে।

শেষ কথা

আইমান সামির মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন কতটা অনিশ্চিত এবং শিশুদের নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই দুর্ঘটনা যেন আর কোনো পরিবারের জীবনে না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ।

একটি নিষ্পাপ প্রাণ হারিয়ে গেল, রেখে গেল অসীম শূন্যতা। আইমানের স্মৃতি হয়তো আমাদের আরও সতর্ক, আরও মানবিক হতে শেখাবে—এটাই এখন প্রত্যাশা।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!