সৌদি আরবে বড় সিদ্ধান্ত: মার্কেটিং ও সেলস খাতে বদলে যাচ্ছে চাকরির নিয়ম
সৌদি আরবে কর্মরত লাখো প্রবাসী কর্মীর জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির সর্বশেষ শ্রমবাজার নীতি। মার্কেটিং ও সেলস খাতে সৌদি নাগরিকদের কর্মসংস্থান বাড়াতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি সরকার। এই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানায়, দেশটির বেসরকারি খাতে মার্কেটিং ও সেলস বিভাগে কর্মরত প্রতিষ্ঠানে এখন থেকে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ কর্মী সৌদি নাগরিক হতে হবে। নতুন এই নীতিমালা সৌদি আরবের শ্রমবাজার সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কোন প্রতিষ্ঠানগুলো এই নিয়মের আওতায় পড়বে
মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় বলা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে তিন বা তার বেশি কর্মী রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম বাধ্যতামূলকভাবে প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ ছোট প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বড় করপোরেট কোম্পানি—সবাইকে নতুন কাঠামোর মধ্যে আসতে হবে।
মার্কেটিং খাতে যেসব পদে প্রযোজ্য
মার্কেটিং খাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদকে সৌদিকরণের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
মার্কেটিং ম্যানেজার
বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞ
গ্রাফিক ডিজাইনার
জনসংযোগ (পিআর) কর্মকর্তা
ব্র্যান্ড ও ডিজিটাল মার্কেটিং সংশ্লিষ্ট পদ
এই পদগুলোতে ভবিষ্যতে সৌদি নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট কোটা পূরণ করতে হবে।
সেলস খাতে নতুন পরিবর্তন
সেলস বা বিক্রয় খাতেও একই ধরনের কঠোর নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিক্রয় ব্যবস্থাপক, সেলস সুপারভাইজার, আইটি ও যোগাযোগ যন্ত্রাংশ বিক্রয় বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পদে সৌদি নাগরিকদের নিয়োগ বাড়ানো হবে। এতে করে প্রবাসী কর্মীদের জন্য এই খাতে কাজ পাওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ন্যূনতম বেতনের শর্ত
সরকারি ঘোষণায় আরও জানানো হয়, এসব পদে নিযুক্ত সৌদি কর্মীদের জন্য ন্যূনতম মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশটির তরুণ নাগরিকদের বেসরকারি খাতে কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং চাকরির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কবে থেকে কার্যকর হবে
নতুন এই নীতিমালা ঘোষণার তিন মাস পর থেকে সারা দেশে কার্যকর হবে। এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মানবসম্পদ কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে এবং নির্ধারিত সৌদিকরণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রবাসী কর্মীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্কেটিং ও সেলস পেশায় নিয়োজিত কয়েক লাখ প্রবাসী কর্মী সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়তে পারেন। অনেক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে সৌদি নাগরিক নিয়োগে জোর দিতে পারে। ফলে নতুন ভিসা পাওয়া যেমন কঠিন হবে, তেমনি বিদ্যমান চাকরি ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
কেন এই সিদ্ধান্ত
সৌদি গ্যাজেটের বরাতে জানা গেছে, শ্রমবাজারের মানোন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটি সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভিশন ২০৩০ এবং সৌদিকরণ
‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার আওতায় সৌদি সরকার ধাপে ধাপে বিভিন্ন খাতে সৌদিকরণ কার্যক্রম জোরদার করছে। ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন এবং খুচরা ব্যবসার পর এবার মার্কেটিং ও সেলস খাতেও এই নীতি আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলো।
প্রতিষ্ঠানগুলোর করণীয়
নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে—
স্থানীয় জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে
সৌদি কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে
বেতন কাঠামো ও মানবসম্পদ নীতিমালা হালনাগাদ করতে হবে
নিয়ম না মানলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীদের জন্য করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসী কর্মীদের এখনই দক্ষতা উন্নয়ন, বিকল্প খাতে কাজের সুযোগ খোঁজা এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নতুন করে সাজানো জরুরি। বিশেষ করে আইটি, টেকনিক্যাল ও বিশেষায়িত দক্ষতা থাকলে চাকরির বাজারে টিকে থাকার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকবে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের এই নতুন সিদ্ধান্ত দেশটির স্থানীয় শ্রমবাজারকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হলেও প্রবাসী কর্মীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধরন এবং শ্রমবাজারের চাহিদার ওপর।
সূত্র: সৌদি গ্যাজেট
