হাত-পা ছাড়াই যিনি বদলে দিয়েছিলেন ‘অসম্ভব’-এর সংজ্ঞা | প্রিন্স রেন্ডিয়ানের অনুপ্রেরণামূলক গল্প
মানুষের জীবনে সীমাবদ্ধতা কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে প্রিন্স রেন্ডিয়ানের নাম বারবার সামনে আসে। জন্মগতভাবে হাত-পা ছাড়া একজন মানুষ কীভাবে সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেন, কীভাবে স্বনির্ভর জীবন গড়ে তুলতে পারেন—তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে আছেন এই অসাধারণ মানুষটি।
১৮৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেন প্রিন্স রেন্ডিয়ান। জন্মের সময়ই চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন, তার শরীরে কোনো হাত বা পা নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় টেট্রা-অ্যামেলিয়া সিনড্রোম—একটি অত্যন্ত বিরল শারীরিক অবস্থা, যেখানে চারটি অঙ্গই অনুপস্থিত থাকে। সেই সময়কার সমাজব্যবস্থায় এমন অবস্থায় জন্ম নেওয়া মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ ছিল না।
অনেকেই ধরে নিতেন, এমন মানুষ আজীবন পরনির্ভরশীল থাকবে। নিজের কোনো কাজ নিজে করতে পারবে না। কিন্তু প্রিন্স রেন্ডিয়ান ধীরে ধীরে এই ধারণাগুলোকেই ভুল প্রমাণ করেন। তিনি দেখিয়ে দেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের সম্ভাবনাকে থামাতে পারে না—যদি মানসিক শক্তি অটুট থাকে।
শৈশব থেকেই তিনি নিজের শরীরকে বোঝার চেষ্টা করেন। কীভাবে ভারসাম্য রাখতে হয়, কীভাবে মাটিতে চলাচল করতে হয়—এসব তিনি নিজেই অনুশীলনের মাধ্যমে রপ্ত করেন। তার চলাফেরার ধরন অনেকটা শুঁয়োপোকার মতো হওয়ায় পরবর্তীতে মানুষ তাকে চিনেছে “দ্য হিউম্যান ক্যাটারপিলার” নামে। যদিও এই নামটি আজকের দৃষ্টিতে বিতর্কিত শোনাতে পারে, তবে সেই সময় এটি ছিল পরিচিতির একটি মাধ্যম।
প্রিন্স রেন্ডিয়ানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার অভিযোজন ক্ষমতা। তিনি শুধুমাত্র মুখ, কাঁধ এবং শরীরের ঊর্ধ্বাংশ ব্যবহার করে দৈনন্দিন নানা কাজ করতে পারতেন। মুখে রেজার ধরে শেভ করা, দিয়াশলাই জ্বালানো, কলম দিয়ে লেখা—এসব কাজ তিনি নিখুঁতভাবে করতেন। এমনকি তিনি ছবি আঁকতেও পারতেন, যা দেখে অনেক সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষও বিস্মিত হতেন।
কিছু কাজের জন্য তিনি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ কাঠের সাপোর্ট ব্যবহার করতেন। এই সাপোর্টের সাহায্যে তিনি বিভিন্ন জিনিস ধরতে পারতেন। অনেক সময় ঠোঁটের মাঝে কলম বা ব্রাশ ধরে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে রেখা টানতেন। এসব কাজ ছিল তার দীর্ঘ অনুশীলন ও আত্মবিশ্বাসের ফল।
তার কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় আসে ১৯৩২ সালে, যখন তিনি আলোচিত সিনেমা ‘Freaks’-এ অভিনয় করেন। সেই সিনেমায় একটি দৃশ্যে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ক্যামেরার সামনে সিগারেট গুটিয়ে নিচ্ছেন, তারপর নিজেই আগুন ধরাচ্ছেন। দৃশ্যটি দর্শকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, কারণ সেখানে কোনো করুণা বা নাটকীয়তা ছিল না—ছিল শুধু আত্মবিশ্বাস।
তবে প্রিন্স রেন্ডিয়ানের জীবন কেবল মঞ্চ বা সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষের মতোই। তিনি ভালোবেসেছেন, সংসার গড়েছেন, পরিবারকে সময় দিয়েছেন। সারাহ নামে এক নারীকে তিনি বিয়ে করেন। তাদের সংসারে ছিল পাঁচটি সন্তান—চার মেয়ে ও এক ছেলে।
একজন বাবা হিসেবে তিনি সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল ছিলেন। পরিবার পরিচালনায় তিনি কখনো নিজেকে বোঝা ভাবেননি, আবার অন্যের করুণার ওপরও নির্ভর করেননি। তার জীবনাচারেই ফুটে উঠেছিল আত্মসম্মান ও আত্মনির্ভরতার শিক্ষা।
অবশ্য তার পথচলা ছিল সহজ নয়। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় ছিল কঠিন। কেউ কেউ তাকে কৌতূহলের চোখে দেখেছে, কেউ বিনোদনের অংশ হিসেবেও বিবেচনা করেছে। কিন্তু প্রিন্স রেন্ডিয়ান এই সব দৃষ্টিভঙ্গিকেই নিজের শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তিনি জানতেন, মানুষের ধারণা বদলাতে হলে আগে নিজেকে বদলাতে হয় না—নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।
তার গল্প আমাদের শেখায়, শারীরিক সক্ষমতা আর মানবিক সক্ষমতা এক জিনিস নয়। ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অসীম সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। আজকের আধুনিক সমাজে, যেখানে অনুপ্রেরণামূলক গল্পের খোঁজ থাকে, প্রিন্স রেন্ডিয়ানের জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।
তিনি কোনো অলৌকিক চরিত্র ছিলেন না। ছিলেন একজন বাস্তব মানুষ—সংগ্রাম, কষ্ট আর সাফল্যে ভরা জীবনের অধিকারী। তার জীবন প্রমাণ করে, মানুষ চাইলে প্রতিকূলতাকে পরাজিত করতে পারে, নিজের মতো করে বাঁচার পথ তৈরি করতে পারে।
প্রিন্স রেন্ডিয়ান তাই কেবল ইতিহাসের একটি নাম নয়। তিনি এক জীবন্ত বার্তা—
“অসম্ভব” শব্দটি অনেক সময় শুধু আমাদের ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
