ইরানকে শেষ সুযোগ দিতে রাজি ট্রাম্প! নেপথ্যে সৌদি, কাতার ও ওমানের কূটনীতি


মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত আপাতত এড়ানো গেছে। ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আরও একবার দেশটিকে “সুযোগ দেওয়ার” সিদ্ধান্তে রাজি করিয়েছে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান। উপসাগরীয় এই তিন দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক তৎপরতায় শেষ মুহূর্তে অবস্থান পরিবর্তন করেন ট্রাম্প।

কূটনীতির নেপথ্যের প্রচেষ্টা

গালফ নিউজের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌদি আরবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা থেকেই সৌদি আরব, কাতার ও ওমান একযোগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ শুরু করে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান যেন তার সদিচ্ছা দেখানোর সুযোগ পায়—এই যুক্তিতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা চলে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলা এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি বলেও জানান তিনি।

কেন এত উদ্বেগ উপসাগরীয় দেশগুলোর

ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও সরকারের দমন-পীড়নকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আসছিল। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছিল, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এর বিপরীতে তেহরানও পাল্টা হুমকি দিয়ে জানায়, হামলা হলে তারা ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও নৌযানে আঘাত হানবে।

এই পাল্টাপাল্টি হুমকির ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। কারণ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েতসহ একাধিক দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনা রয়েছে। কোনো সংঘাত শুরু হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে।

সামরিক সতর্কতা ও কর্মী প্রত্যাহার

উত্তেজনার মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে, গত বুধবার কাতারের একটি প্রধান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে কিছু কর্মী সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন মিশনের কর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়।

এই পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, পরিস্থিতি যে কোনো সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারত। এমন প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন

বেশ কয়েকবার কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করে তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। তিনি জানান, “অন্য পক্ষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র” থেকে তিনি এমন নিশ্চয়তা পেয়েছেন যে, ইরান বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে না।

এই ঘোষণার পরই বোঝা যায়, ওয়াশিংটন আপাতত সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে আসছে। কূটনৈতিক মহলে এটি সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের প্রচেষ্টার একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘অনিচ্ছাকৃত সংঘাত’ এড়ানোর চেষ্টা

সৌদি ওই কর্মকর্তা জানান, মূল লক্ষ্য ছিল অনিচ্ছাকৃত ও অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি এড়ানো। তাঁর ভাষায়, ইরানের ওপর কোনো সামরিক হামলা হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার পথ খুলে যেত।

তিনি বলেন, “আমাদের ওয়াশিংটনকে স্পষ্টভাবে জানাতে হয়েছে যে, একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।” এই বার্তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।

আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ

যদিও সামরিক হামলার আশঙ্কা আপাতত কমেছে, তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সৌদি কর্মকর্তার মতে, তৈরি হওয়া আস্থা ও ইতিবাচক পরিবেশ ধরে রাখতে এখনো নিবিড় যোগাযোগ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, এই সংকট সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য বেশ কয়েকটি “নির্ঘুম রাত” কেটেছে।

ইরানকে দেওয়া স্পষ্ট বার্তা

উপসাগরীয় অঞ্চলের আরেকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—এই অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনায় কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থাৎ, কূটনৈতিক সুযোগ দেওয়া হলেও সীমা অতিক্রম করলে তার মূল্য দিতে হবে—এই বার্তাও পরিষ্কারভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তেহরানের কাছে।

মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি এখনো চলমান

এদিকে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক প্রস্তুতিও পুরোপুরি শিথিল করেনি। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের নির্দেশে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং এর সঙ্গে থাকা স্ট্রাইক গ্রুপ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত একটি কৌশলগত বার্তা—কূটনীতি চললেও যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কী বলছে

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ আবারও দেখিয়ে দিল, মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য উত্তেজনাও কত দ্রুত আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের সক্রিয় ভূমিকা প্রমাণ করে, আঞ্চলিক দেশগুলো এখন সংঘাত নয় বরং স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দিতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানকে “আরও একবার সুযোগ দেওয়ার” সিদ্ধান্ত হয়তো সাময়িক স্বস্তি এনেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সংস্কার, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি এবং আঞ্চলিক আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ জরুরি।

উপসংহার

সব মিলিয়ে, ইরান ইস্যুতে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত এড়াতে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের কূটনৈতিক উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন আপাতত মধ্যপ্রাচ্যে বড় যুদ্ধের আশঙ্কা কমিয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো সংবেদনশীল, আর তাই কূটনীতি ও সংযমই যে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!