লাতিন আমেরিকায় নতুন উত্তেজনা: ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে কাঁপছে তিন দেশ
লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে আবারও উত্তাপ ছড়াল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে। কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা ও কিউবাকে ঘিরে তার দেওয়া কড়া বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক অঙ্গনেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের লাতিন আমেরিকা নীতিতে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করছে।
রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলাকে “গভীর সংকটে থাকা রাষ্ট্র” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বলেন, দেশটির বর্তমান প্রশাসন কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। যদিও ট্রাম্পের এসব মন্তব্যকে কলম্বিয়া সরকার দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক বার্তায় ট্রাম্পের বক্তব্যকে “ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে। পেত্রোর মতে, ঐক্যের অভাব থাকলে বড় শক্তিগুলো অঞ্চলটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।
পেত্রো আরও বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বহিরাগত হস্তক্ষেপ কখনোই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। বরং পারস্পরিক সহযোগিতা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক বোঝাপড়াই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। তার এই বক্তব্য লাতিন আমেরিকার অন্যান্য নেতাদের কাছ থেকেও সমর্থন পেয়েছে।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ট্রাম্পের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারাকাসে সাম্প্রতিক মার্কিন আইন প্রয়োগকারী অভিযানের পর তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও ভেনেজুয়েলার ওপর প্রভাব বজায় রেখেছে। ট্রাম্পের ভাষায়, ভেনেজুয়েলা যদি তার আচরণ পরিবর্তন না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। দেশটির সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে তেল খাতকে কেন্দ্র করেই আগ্রহ দেখাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
কিউবা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দেশটি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বাইরের কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সেখানে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা কমে যাওয়ায় কিউবার অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। যদিও কিউবার পক্ষ থেকে এসব মন্তব্যকে অতিরঞ্জিত ও রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মেক্সিকোকেও ট্রাম্প সতর্কবার্তা দিয়েছেন, বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক পাচার ইস্যুতে। তবে একইসঙ্গে তিনি মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউমের নেতৃত্বের প্রশংসাও করেন। ট্রাম্প জানান, দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ যৌথ বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, উরুগুয়ে ও স্পেন একসঙ্গে জানায়, যেকোনো ধরনের একতরফা পদক্ষেপ আঞ্চলিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তারা কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্যগুলো তার পরিচিত কৌশলেরই অংশ, যেখানে শক্ত অবস্থান নিয়ে আলোচনায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এমন বক্তব্য কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি পারস্পরিক সহযোগিতা ও বহুমুখী কূটনীতির দিকে ঝুঁকছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা আরও বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এসব মন্তব্যের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দৃঢ় ভাবমূর্তি তুলে ধরার কৌশল হিসেবেই এমন বক্তব্য আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা সরাসরি সংঘাত নয়, বরং কূটনৈতিক ও বহুপাক্ষিক সমাধানের পথেই এগোতে চায়। ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর।
