একই কবরস্থানে চিরনিদ্রায় স্বামী–স্ত্রী ও শিশু সন্তান, উত্তরা অগ্নিকাণ্ডে হৃদয়বিদারক পরিণতি


রাজধানীর উত্তরা এলাকায় সংঘটিত এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিয়েছে একটি পরিবারের সব আলো। আগুনে প্রাণ হারানো ছয়জনের মধ্যে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার একই পরিবারের তিন সদস্য—স্বামী, স্ত্রী ও তাদের দুই বছরের শিশু সন্তানকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। হৃদয়বিদারক এই দৃশ্য শনিবার এলাকাবাসী ও স্বজনদের চোখে জল এনে দেয়।

শেষ বিদায়ে ভারী হয়ে ওঠে গ্রাম

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকাল থেকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া কাজীবাড়ি এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। বেলা ১১টায় পারিবারিক কবরস্থানে জানাজা শেষে একসঙ্গে দাফন করা হয় কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের একমাত্র সন্তান কাজী ফাইয়াজ রিশানকে।

জানাজায় অংশ নেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। একসঙ্গে তিনটি কবর খোঁড়া হয়, পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় একটি সম্পূর্ণ পরিবারকে। উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

যারা আর ফিরবে না

নিহত কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী ছিলেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া কাজী বাড়ির বাসিন্দা। তার পিতা কাজী খোরশেদ আলম এলাকায় পরিচিত একজন ব্যক্তি। আফরোজা আক্তার সুবর্ণা ছিলেন একজন স্নেহশীলা মা, আর ছোট্ট রিশান ছিল পরিবারের একমাত্র আলো।

স্থানীয়দের ভাষায়, রিশানের হাসিতেই যেন ঘর ভরে উঠত। আজ সেই ঘর শুনশান, নিস্তব্ধ।

জীবনের কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে নতুন শুরু

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কাজী ফজলে রাব্বির জীবনে এই ট্র্যাজেডি প্রথম নয়। প্রায় দুই বছর আগে আকস্মিক অসুস্থতায় মারা যান তার প্রথম স্ত্রী তিথী। সেই মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন তিনি। দীর্ঘ সময় শোক কাটাতে না পারলেও পরিবার ও আত্মীয়দের অনুরোধে পরে আবার বিয়ে করেন তিথীর বান্ধবী আফরোজা বেগম সুবর্ণাকে।

নতুন এই সংসারে আসে ফুটফুটে ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান। সন্তানকে ঘিরেই আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন ফজলে রাব্বি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যায়।

প্রতিদিনের রুটিন, সেদিন ছিল ব্যতিক্রম

পরিবারের সদস্যরা জানান, ফজলে রাব্বি প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়ার আগে তার ছেলে রিশানকে উত্তরার নানুর বাসায় রেখে যেতেন। কাজ শেষে আবার সেখান থেকেই সন্তানকে নিয়ে বাসায় ফিরতেন। এতে শিশুটি সবসময় নিরাপদে থাকত।

কিন্তু শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সেদিন তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নিজ বাসাতেই ছিলেন। এই সিদ্ধান্তই যেন হয়ে ওঠে নিয়তির নির্মম পরিহাস। ঠিক সেই সময়ই উত্তরার ওই আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

আগুনে মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু

ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে। উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের একটি সাততলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় পুরো ফ্লোর।

স্থানীয়রা আগুন দেখতে পেয়ে দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করেন এবং ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় ২৫ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আরও সময় নিয়ে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়।

হাসপাতালে নেওয়ার আগেই নিভে যায় প্রাণ

স্থানীয়দের সহায়তায় আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। আফরোজা আক্তার সুবর্ণাকে নেওয়া হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। তবে জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে, ফজলে রাব্বি ও ছোট্ট রিশানের মরদেহ নেওয়া হয় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানান, ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টজনিত কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

স্বজনদের কান্নায় ভারী হাসপাতাল প্রাঙ্গণ

আফরোজার বোন আফরিন জাহান বলেন, “আমরা কেউ ভাবতেও পারিনি এমন কিছু হবে। ওরা তিনজনই ভালো ছিল। ধোঁয়ার কারণে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালে আনার পর সব শেষ।”

হাসপাতালের সামনে স্বজনদের আহাজারি ছিল হৃদয়বিদারক। ছোট্ট রিশানের নিথর দেহ দেখে অনেকেই ভেঙে পড়েন।

এলাকায় শোকের ছায়া

মরদেহ গ্রামে পৌঁছানোর পর পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের স্তব্ধতা। প্রতিবেশীরা জানান, ফজলে রাব্বি ছিলেন ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। পরিবার নিয়ে তিনি খুব সুখে ছিলেন।

এক প্রতিবেশী বলেন, “একসঙ্গে বাবা-মা আর শিশুকে হারানো খুব কষ্টের। এই শোক কোনোভাবেই সহ্য করার মতো নয়।”

অগ্নিকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক ছিল কি না, দ্রুত ধোঁয়া বের হওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের কারণ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

একসঙ্গে তিনটি কবর, তিনটি নিঃশেষ জীবন

চিওড়া কাজীবাড়ি কবরস্থানে পাশাপাশি তিনটি কবর এখন নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে একটি পরিবারের সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ার গল্প। স্বামী, স্ত্রী ও শিশু—একসঙ্গে চিরনিদ্রায় শায়িত।

এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, একটি মুহূর্তেই জীবন কতটা অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

উপসংহার

উত্তরার অগ্নিকাণ্ডে একটি পরিবারের এমন মর্মান্তিক পরিণতি শুধু তাদের স্বজনদের নয়, পুরো সমাজকেই নাড়া দিয়েছে। পাশাপাশি কবরে দাফন হওয়া স্বামী–স্ত্রী ও শিশুসন্তানের গল্প মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক গভীর বেদনার প্রতিচ্ছবি। ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ঘটনা আর কোনো পরিবারকে নিঃস্ব না করে—সেই সচেতনতা ও নিরাপত্তাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!