বিভ্রান্তি ছড়ালে কি আইনি পদক্ষেপ আসছে? ইলিয়াস হোসেন প্রসঙ্গে সারজিসের কড়া মন্তব্য
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার) কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম এখন শুধু ব্যক্তিগত মত প্রকাশের জায়গা নয়, বরং রাজনৈতিক আলোচনা, জনমত গঠন এবং সংবাদ প্রবাহের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ ও তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকটিভিস্ট ইলিয়াস হোসেনকে ঘিরে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য প্রার্থী সারজিস আলম তার বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেছেন। বুধবার দুপুরে পঞ্চগড়ের দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সারজিস আলম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা খুশি তাই পোস্ট করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষায়, “কেউ এমন ভাবতে পারেন না যে তিনি যা করবেন, তাই করেই পার পেয়ে যাবেন।” তিনি মনে করেন, পরিচিতি বা অনুসারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় কেউ আইন ও নৈতিকতার ঊর্ধ্বে চলে যেতে পারেন না।
সারজিস আলমের বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় উঠে আসে—প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ এবং দ্বিতীয়ত, এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। তিনি বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হলে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানিও ঘটে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শুধু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বা পেজ বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজনে দেশে বা দেশের বাইরে যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তার মতে, এতে করে ভবিষ্যতে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়াতে নিরুৎসাহিত হবে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই ছাড়াই পোস্ট করার প্রবণতা বেড়েছে। অনেক সময় ব্যক্তিগত মতামতকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আবার কখনো গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের তথ্য জনমনে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।
সারজিস আলমের বক্তব্য সেই বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গেই যুক্ত। তিনি মনে করেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া প্রতিটি বক্তব্যের একটি সামাজিক প্রভাব রয়েছে, যা অনেক সময় বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্ত ও আচরণকে প্রভাবিত করে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সারজিস আলম আরও বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, তবে তা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যমে প্রকাশ না পায়। তিনি বলেন, গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, কিন্তু অসত্য তথ্য দিয়ে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা সারজিস আলমের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান। দলীয় নেতাদের মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য অনলাইন ও অফলাইন—দুই ক্ষেত্রেই শালীনতা ও সত্যনিষ্ঠা বজায় রাখা জরুরি।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একটি অংশ মনে করেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা ও আইনের প্রয়োগ আরও স্বচ্ছ হওয়া দরকার। এতে করে একদিকে যেমন ভুয়া তথ্যের বিস্তার কমবে, অন্যদিকে প্রকৃত মত প্রকাশকারীরাও নিরাপদ থাকবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি রোধে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও জরুরি। রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এ ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করা উচিত।
ইলিয়াস হোসেনকে ঘিরে এই আলোচনা আবারও প্রমাণ করে, বাংলাদেশে অনলাইন বক্তব্য ও তার দায়বদ্ধতা নিয়ে জনপরিসরে একটি শক্ত আলোচনা প্রয়োজন। সারজিস আলমের বক্তব্য সেই আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিষয়টি এখন কেবল একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সত্য, শালীনতা ও দায়িত্ববোধ বজায় রাখাও সমান জরুরি। সারজিস আলমের বক্তব্য এই ভারসাম্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
