সৌদি আরবে কর্মী পাঠিয়ে নতুন রেকর্ড বাংলাদেশ: এক বছরে গেল সাড়ে সাত লাখ


বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে নতুন একটি মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)–এর তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে সৌদি আরবে সাড়ে সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক গেছেন, যা একক কোনো দেশে সর্বোচ্চ কর্মী প্রেরণের রেকর্ড।

সৌদি আরব কেন শীর্ষে

বিএমইটি জানায়, ২০২৫ সালে বিদেশে গেছেন মোট ১১ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সৌদি আরবকে গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের সুযোগ, দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল শ্রমবাজার এই প্রবণতাকে জোরদার করেছে।

সরকারি তথ্য কী বলছে

বিএমইটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক আশরাফ হোসেন জানান, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানোর হার বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। আগের বছর যেখানে প্রায় ৬ লাখ ২৮ হাজার কর্মী গিয়েছিলেন, সেখানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবস্থান

বর্তমানে সৌদি আরবে বসবাস ও কর্মরত বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। ১৯৭০-এর দশক থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকরা দেশটিতে কাজ করছেন এবং বর্তমানে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় প্রবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। এই প্রবাসীরা প্রতি বছর বাংলাদেশে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠান, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

দক্ষ কর্মীর চাহিদা বৃদ্ধি

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। ২০২৩ সালে চালু হওয়া সৌদি আরবের স্কিল ভেরিফিকেশন প্রোগ্রাম–এর মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের পেশাগত দক্ষতা যাচাই করা হচ্ছে। এর ফলে নির্মাণ, বিদ্যুৎ, মেকানিক্যাল, হসপিটালিটি ও সার্ভিস সেক্টরে দক্ষ কর্মীদের সুযোগ বাড়ছে।

দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রভাব

২০২৫ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন কর্মসংস্থান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় কর্মীদের মজুরি পরিশোধ, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই চুক্তি কর্মীদের আস্থা বাড়িয়েছে এবং কর্মী পাঠানোর হার বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

ভিশন ২০৩০ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ প্রকল্পের আওতায় ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন শহর নির্মাণ ও পরিষেবা খাতে বড় বিনিয়োগ চলছে। এসব প্রকল্পে ২০২৬ সালে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য প্রায় তিন লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিতে প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবে কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা এবং কর্মসংস্থানের চাপ কমাতে এই প্রবণতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

তবে কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় আরও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বৈধ প্রক্রিয়ায় অভিবাসন নিশ্চিত করা গেলে এই সাফল্য আরও টেকসই হবে।

উপসংহার

সৌদি আরবে রেকর্ডসংখ্যক কর্মী প্রেরণ শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়— এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার একটি স্পষ্ট চিত্র। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে এই সাফল্য আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!