নতুন বিশ্বব্যবস্থা: শক্তির রাজনীতিতে বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর মানচিত্র
এক সময় বিশ্ব রাজনীতি ছিল তুলনামূলকভাবে অনুমানযোগ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের প্রধান নেতৃত্বদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মুক্ত বাজার—এই তিন নীতির ব্যানারে তারা দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে পরিচালনা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেই একক নেতৃত্বের যুগ হয়তো শেষের পথে।
ভেনেজুয়েলা থেকে ইউক্রেন, আবার ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই নতুন প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ভূমিকা ঘিরে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা তুঙ্গে।
যুক্তরাষ্ট্রের বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাষা বরাবরই সরাসরি ও বিতর্কিত। আগের মার্কিন প্রশাসনগুলো যেখানে কূটনৈতিক শব্দচয়ন ব্যবহার করত, সেখানে ট্রাম্প অনেক সময় খোলাখুলি জাতীয় স্বার্থের কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে—যুক্তরাষ্ট্র আর পুরো পৃথিবীর “পাহারাদার” হতে চায় না।
সাম্প্রতিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রেও সেই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়। সেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক আধিপত্যের পরিবর্তে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখাকে বেশি গুরুত্ব দেবে। অর্থাৎ, পুরো পৃথিবী নয়—নিজের গোলার্ধই হবে প্রধান অগ্রাধিকার।
মনরো নীতির পুনরাগমন?
এই প্রেক্ষাপটে আবার আলোচনায় এসেছে ঐতিহাসিক “মনরো নীতি”। উনিশ শতকে ঘোষিত এই নীতির মূল কথা ছিল—ইউরোপীয় শক্তিগুলো যেন আমেরিকা মহাদেশে হস্তক্ষেপ না করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নীতিই লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
আজকের বাস্তবতায় অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেই পুরোনো নীতিকেই আধুনিক রূপে ফিরিয়ে আনতে চাইছে। ভেনেজুয়েলা নিয়ে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থান সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন প্রসঙ্গ
অন্যদিকে, ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নরম কূটনৈতিক সুর অনেকের নজর কেড়েছে।
২০১৯ সাল থেকেই বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শোনা যায়—যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতা হতে পারে কি না। যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ নেই, তবুও বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এমন সন্দেহকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে দেয় না।
ইউরোপের দুর্বল অবস্থান
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংকটগুলোতে ইউরোপের প্রতিক্রিয়া অনেক সময়ই ধীর ও বিভক্ত মনে হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপীয় নিরাপত্তা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসে, তাহলে এই জোট কতটা কার্যকর থাকবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, তখন ছোট ও মাঝারি দেশগুলো সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়ে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার ধারণা
এই সব ঘটনার মধ্য দিয়ে যে ধারণাটি স্পষ্ট হচ্ছে, তা হলো—বিশ্ব হয়তো আবার “প্রভাব বলয়”-এর দিকে ফিরছে। অর্থাৎ, কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজ নিজ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন বা নৈতিকতার চেয়ে শক্তির রাজনীতিই বেশি প্রাধান্য পেতে পারে।
এটি অনেকটা শীতল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মতো, তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও অর্থনীতির কারণে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব
ইতিহাস বলে, বাইরে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করলে তার প্রভাব দেশের ভেতরেও পড়ে। নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক চর্চা—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আসে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, বৈদেশিক কঠোরতা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও আরও মেরুকৃত করতে পারে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের ভূমিকা কী? ইতিহাস সাক্ষী, বিশ্বব্যবস্থার বড় পরিবর্তন শুধু রাষ্ট্রনায়কদের সিদ্ধান্তে নয়, জনগণের সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেও গড়ে ওঠে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থা যদি সত্যিই বাস্তব হয়, তাহলে তা কেমন হবে—সহযোগিতার নাকি সংঘাতের? সেই উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, বিশ্ব রাজনীতি এক বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর তার প্রভাব আগামী প্রজন্ম পর্যন্ত অনুভূত হবে।
