নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তায় নতুন সিদ্ধান্ত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সারাদেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ভোটগ্রহণের আগে ও পরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবার টানা সাত দিনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা সর্বশেষ পরিপত্রে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ভোটকে কেন্দ্র করে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। এর মধ্যে রয়েছে ভোটের চার দিন আগে, ভোটের দিন এবং ভোটের পরের দুই দিন।
কেন ৭ দিনের নিরাপত্তা বলয়?
নির্বাচন একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের মতামত দিতে পারেন, সেজন্য একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অতীত অভিজ্ঞতা ও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। এসব বিবেচনায় আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই সাত দিনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কতজন ভোটার, কতগুলো কেন্দ্র
এবারের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা প্রায় পৌনে ১৩ কোটি। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্রে আনুমানিক দুই লাখ ৬০ হাজার ভোটকক্ষ থাকবে বলে প্রাথমিক হিসেবে জানা গেছে।
প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গড়ে ১৩ থেকে ১৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রের গুরুত্ব ও ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী এই সংখ্যা কমবেশি হতে পারে।
মাঠে থাকছে ৭ লাখের বেশি সদস্য
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ৭ লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে আনসার ও ভিডিপি সদস্যের সংখ্যাই প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ।
এছাড়াও প্রায় ৯০ হাজারের বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সারাদেশে মোতায়েন থাকবে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য বাহিনীও নির্বাচনি দায়িত্বে অংশ নেবে। সব বাহিনী সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। তফসিল ঘোষণার আগে দুই দফা এবং পরে একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইসি।
এই বৈঠকগুলোতে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এসব বৈঠকের সুপারিশের ভিত্তিতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক পরিপত্র জারি করে।
ভোটারদের জন্য বার্তা
নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকবে, যাতে কেউ ভয় বা চাপ ছাড়া ভোট দিতে পারেন।
ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একযোগে কাজ করবে।
প্রার্থীদের নিরাপত্তাও গুরুত্ব পাচ্ছে
শুধু ভোটকেন্দ্র নয়, প্রার্থী, নির্বাচন অফিস এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর কিছু নির্বাচনি অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর এই সিদ্ধান্ত আরও জোরালো হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অফিসে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই মূল লক্ষ্য
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, এই নির্বাচন হবে অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের মূল উদ্দেশ্য কোনো পক্ষকে প্রভাবিত করা নয়, বরং গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষা করা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সাত দিনের টানা মোতায়েনের মাধ্যমে ভোটের আগে ও পরে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এখন দেখার বিষয়, এই প্রস্তুতি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং ভোটাররা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
