নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হবে? নিরপেক্ষ ভোটের নির্দেশ সেনাপ্রধানের


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সৈনিকদের পেশাদারত্ব, সংযম এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেবে না এবং পুরো প্রক্রিয়া হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ।

সেনানিবাসে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা

রোববার (১৮ জানুয়ারি) ঢাকা সেনানিবাসে আয়োজিত পৃথক দুটি সভায়—একটি সৈনিকদের সঙ্গে দরবার এবং অন্যটি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অফিসার্স অ্যাড্রেসে—সেনাপ্রধান এসব নির্দেশনা দেন। রাজধানীর বাইরে কর্মরত কর্মকর্তারাও অনলাইনের মাধ্যমে সভায় যুক্ত ছিলেন। সভায় নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালনের নীতিমালা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

নিরপেক্ষতার বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা

সেনাপ্রধান তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেন, নির্বাচনের সময় কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাত বা রাজনৈতিক প্রভাব গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি উল্লেখ করেন, ভোটের মাঠে সেনাবাহিনীর একমাত্র পরিচয় হবে—রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে দায়িত্ব পালন। জনগণ যাতে ভয়ভীতি ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে, সেটিই সেনাবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য।

অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে রাখতে হবে, যাতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ভোটাররা নিশ্চিন্তে ভোট দিয়ে ঘরে ফিরতে পারবেন। এজন্য সেনাবাহিনীকে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

গুজব ও উসকানির বিরুদ্ধে সতর্কতা

সভায় সেনাপ্রধান বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় এসব বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না। ধৈর্য ও পেশাদার আচরণ বজায় রেখেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

সহিংসতা রোধে কঠোর অবস্থান

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সেনাবাহিনীকে কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেন সেনাপ্রধান। তিনি জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়।

সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ

সেনাপ্রধান তার বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন সংকটময় সময়ে সেনাবাহিনী নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা দেশ ও জাতি স্মরণ রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন শেষে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে সেনাবাহিনীকে পুনরায় ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে। এটি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা

বিশ্লেষকদের মতে, সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য নির্বাচনকালীন রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ অবস্থান ভোটারদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে এবং নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার পথে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

উপসংহার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করার এই নির্দেশনা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে স্পষ্ট—সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক শক্তির নয়, বরং জনগণের ভোটাধিকার ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্বেই নিয়োজিত থাকবে।

সব মিলিয়ে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর এই অবস্থান একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ গঠনে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গিনি-বিসাউয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রেসিডেন্ট ও নেতাদের আটক, নির্বাচনী পরিস্থিতি স্থগিত

এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না কেন? দেশের বাইরে থাকা নেতার আসল সত্য!